মুছে যায়নি দিনগুলি, ফুরোয়নি হেমন্ত
‘তুমি এলে, অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এল’, ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়’, ‘এই রাত তোমার আমার’, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ কিংবা ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে’—বাংলা গানের শ্রোতা অথচ এই গানগুলোর সঙ্গে কখনো পরিচয় হয়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও গানগুলো হারিয়ে যায়নি; বরং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন করে। রেডিও, গ্রামোফোন, ক্যাসেট, সিডি পেরিয়ে এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও জায়গা করে নিয়েছে সেসব গান। আর এই দীর্ঘ যাত্রার সারথি একজন মানু
‘তুমি এলে, অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এল’, ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়’, ‘এই রাত তোমার আমার’, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ কিংবা ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে’—বাংলা গানের শ্রোতা অথচ এই গানগুলোর সঙ্গে কখনো পরিচয় হয়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও গানগুলো হারিয়ে যায়নি; বরং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন করে। রেডিও, গ্রামোফোন, ক্যাসেট, সিডি পেরিয়ে এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও জায়গা করে নিয়েছে সেসব গান। আর এই দীর্ঘ যাত্রার সারথি একজন মানুষ—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। প্রেমে পড়া তরুণের না-বলা অনুভূতি, বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস, মধ্যবিত্ত জীবনের নস্টালজিয়া কিংবা একাকী মানুষের নির্ভরতার জায়গা—সবখানেই বারবার ফিরে এসেছে তাঁর গান। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনের নানা পরতে আজও টের পাওয়া যায় তাঁর উপস্থিতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর, ক্যানটিন থেকে শহর–বন্দরের অলিগলি, চট্টগ্রামের ডিসি হিল থেকে রাজশাহীর পদ্মাপাড়—সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনের নানা পরতে ছড়িয়ে আছে তাঁর কণ্ঠের উপস্থিতি। কোনো নাট্যদলের মহড়াকক্ষ, পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বর্ষার বিকেলে জানালার পাশে একা বসে থাকা একজন মানুষ—সমানভাবে আপন হয়ে ওঠে তাঁর গান। সেই শৈশব, কৈশোরে শরৎকালের দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে, স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, এমনকি ছোট্ট সেলুনের দোকানেও বহুবার শুনেছি তাঁর গান। কখনো কখনো মনে হয়েছে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি বাঙালির জীবনযাপনেরই অংশ বটে। গ্রামোফোন ও ফিতার যুগ অনেক আগেই ইতিহাস হয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে গান শোনার মাধ্যমও। কিন্তু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আবেদন যেন বদলায়নি। কারণ, তিনি কেবল গান গাইতেন না; তিনি মানুষের অনুভূতিকে সুর আর কণ্ঠে এমনভাবে রূপ দিতেন, যেন প্রতিটি গান হয়ে উঠত শ্রোতার নিজের জীবনেরই একটি অংশ। তাঁর গায়কির বড় শক্তি ছিল এই সহজাত আন্তরিকতা। কোনো জটিল কারুকাজ নয়, কোনো প্রদর্শন নয়—শুধু গভীর মমতায় বলা কিছু কথা, যা শ্রোতার হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছে। গ্রামোফোন ও ফিতার যুগ অনেক আগেই ইতিহাস হয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে গান শোনার মাধ্যমও। কিন্তু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আবেদন যেন বদলায়নি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গতকাল মঙ্গলবার ১৬ জুন ছিল তাঁর জন্মদিন। বাংলা গানের ইতিহাসে এই দিনটি শুধু একজন শিল্পীর জন্মদিন নয়, একটি সাংস্কৃতিক যুগের জন্মদিন বললে কি বাড়াবাড়ি হবে? যে যুগের নাম—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। জন্মের এক শতাব্দীর বেশি সময় পরও তিনি কেবল স্মৃতির অংশ হয়ে থাকেননি; বরং নতুন করে ফিরে এসেছেন প্রতিটি প্রজন্মের কাছে। যেমন গতকাল জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে ভেসে বেড়িয়েছে তাঁর ছবি, গান ও স্মৃতিচারণা। কেউ ভাগ করে নিয়েছেন প্রিয় গান, কেউ লিখেছেন তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত স্মৃতি। ইউটিউব, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম কিংবা ফেসবুকের ভিডিওতে নতুন করে শুনেছেন তাঁর গান হাজারো মানুষ। এ যেন আরেকবার ফিরে আসা—কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজনের নয়, মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকার শক্তিতে। কিন্তু কীভাবে বেনারসের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হয়ে উঠলেন বাংলা গানের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী কণ্ঠগুলোর একজন? কীভাবে গল্পলেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখা সেই তরুণ ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন বাংলা ও ভারতীয় সংগীতের এক অনিবার্য অধ্যায়? জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক সেই দীর্ঘ পথচলা, সংগ্রাম, সাফল্য আর কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্প। বেনারসের সেই শিশুটি ১৯২০ সালের ১৬ জুন বেনারসে জন্ম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের। পরে পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন কলকাতায়। ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনার সময়ই তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুই উজ্জ্বল নাম—কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষের সঙ্গে। মজার বিষয় হলো, তখন কেউই হেমন্তকে ভবিষ্যতের গায়ক হিসেবে দেখতেন না। বন্ধুদের মধ্যে সুভাষ ছিলেন কবিতাপ্রবণ, সন্তোষের ঝোঁক ছিল সাহিত্যচর্চায়, আর হেমন্ত নিজেও স্বপ্ন দেখতেন লেখক হওয়ার। ছোটগল্প লিখতেন, এমনকি জনপ্রিয় সাহিত্য পত্রিকা ‘দেশ’-এ তাঁর গল্পও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু নিয়তি তাঁর জন্য অন্য এক ইতিহাস লিখে রেখেছিল। সংগীতের প্রতি টান অবশ্য ছিল ছোটবেলা থেকেই। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তালিম ছাড়াই গ্রামোফোনে গান শুনে শুনে সুর আত্মস্থ করতেন। বন্ধু শ্যামসুন্দরের বাড়ির হারমোনিয়াম, গ্রামোফোন আর রেকর্ডই ছিল তাঁর প্রথম সংগীত বিদ্যালয়। নতুন কোনো গান শুনলেই সেটি গলায় তোলার চেষ্টা করতেন। তখনো তিনি জানতেন না, একদিন তাঁর নিজের কণ্ঠই কোটি মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠবে। স্কুলজীবনেই ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা, যা পরবর্তীকালে তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক হয়ে ওঠে। একদিন ক্লাসে বন্ধুদের সঙ্গে গান গাওয়ার অপরাধে তাঁকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। খবর শুনে সহপাঠীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। আর্থিকভাবে সচ্ছল না হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বাবা শিক্ষকদের কাছে গিয়ে ছেলের জন্য অনুরোধ করেন। শেষ পর্যন্ত বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। ঘটনাটি হেমন্তের জীবনে শুধু একটি বিব্রতকর স্মৃতি নয়; বরং তাঁর চরিত্র গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অপমান, প্রত্যাখ্যান কিংবা অবহেলার মুখে তিনি কখনো তিক্ত হননি। বরং বাবার বিনয়, ধৈর্য ও সহনশীলতা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তী জীবনে বহু বাধা, ব্যর্থতা ও অবমূল্যায়নের মুখোমুখি হলেও তিনি কখনো উচ্চকণ্ঠ হননি। নীরবে নিজের কাজ করে গেছেন। সেই নীরব অধ্যবসায়ই একসময় তাঁকে বাংলা গানের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন করে তোলে। তাঁর গায়কির বড় শক্তি ছিল এই সহজাত আন্তরিকতা। কোনো জটিল কারুকাজ নয়, কোনো প্রদর্শন নয়—শুধু গভীর মমতায় বলা কিছু কথা, যা শ্রোতার হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ফেসবুক থেকে সংগৃহীত সুভাষের হাত ধরে রেডিওতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীতজীবনের শুরুর গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর একজন তাঁর স্কুলজীবনের বন
📌 Kaynak
Bu haber XML kaynağından derlenmiştir. Tamamı için orijinal habere gidin.
Orijinal haberi oku →