খুলনায় নদী খননের মাটিতে চাপা পড়েছে আশ্রয়ণের শতাধিক ঘর
হাতে থাকা ছোট একটি লোহার টুকরা দিয়ে ইটের ওপর থেকে পলেস্তারা সরাচ্ছিলেন পারুল বেগম। একটি ইট কিছুটা পরিষ্কারের পর তিনি দেয়াল থেকে পরের ইটটি আলাদা করতে শুরু করেন। মাথার ওপর পাহাড়সম মাটির স্তূপ। সেই মাটির নিচেই চাপা পড়েছে তাঁর শেষ সম্বলের ঘর। পুনর্বাসন না করেই নদী খননের মাটি ঘরের ওপর ফেলায় পারুলসহ দেড় শতাধিক মানুষ বিপদে পড়েছেন। আশ্রয়ণের শেষ সম্বল হারিয়ে দিশাহারা অবস্থায় দিন পার করছেন তাঁরা। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আপার ভদ্রা নদী পুনঃখননের কাজের কারণে চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পের পারুল
হাতে থাকা ছোট একটি লোহার টুকরা দিয়ে ইটের ওপর থেকে পলেস্তারা সরাচ্ছিলেন পারুল বেগম। একটি ইট কিছুটা পরিষ্কারের পর তিনি দেয়াল থেকে পরের ইটটি আলাদা করতে শুরু করেন। মাথার ওপর পাহাড়সম মাটির স্তূপ। সেই মাটির নিচেই চাপা পড়েছে তাঁর শেষ সম্বলের ঘর। পুনর্বাসন না করেই নদী খননের মাটি ঘরের ওপর ফেলায় পারুলসহ দেড় শতাধিক মানুষ বিপদে পড়েছেন। আশ্রয়ণের শেষ সম্বল হারিয়ে দিশাহারা অবস্থায় দিন পার করছেন তাঁরা। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আপার ভদ্রা নদী পুনঃখননের কাজের কারণে চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পের পারুল বেগমসহ দেড় শতাধিক মানুষের ঘরের এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। মাটি সরিয়ে পারুলের ইট সরানোর কারণ—ভবিষ্যতে যদি কখনো আবার ঘর তৈরির সুযোগ পাওয়া যায়। পারুল বেগম এখন চুকনগর গরুর হাটের মাঠে একটি অস্থায়ী খুপরিতে থাকছেন। তাঁর মতো আরও অসংখ্য পরিবার সেখানে অস্থায়ী আবাস গড়েছে। রাবেয়া বেগম, চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আমাদের ঘর, বাথরুম কিছুই নেই। সব ভেঙে দিয়েছে। সবকিছু ভেঙেচুরে মাটির তলে। আমাদের কোনো আশ্রয় নেই। এখন কোনো পথ দেখছি না। সেখানকার বাসিন্দা রিজিয়া বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাঙকাটা ওয়ালারা ঘর একদম ভেঙে দিয়ে গেছে। পাঁচ-ছয় মাস হয়ে গেছে এই ঘটনা। আমরা এখন গরুর হাটের মাঠে থাকছি। ভোটের আগে নেতারা এসে বলেছিল, ঘর দেবে। কিন্তু এখন তো কেউ কিছু বলে না। আমাদের ঘর নেই, বাথরুম নেই। একটু বৃষ্টি হলে মাঠে পানি ওঠে। পানির তলে ভাসতিছি। কয়টা টিউবওয়েল ছিল এখানে, একটাও নেই। সব মাটির নিচে।’ রিজিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় পাশে ছিলেন হাজেরা। আশ্রয়ণের ১৭ নম্বর ঘরটি তাঁর ছিল। হতাশ কণ্ঠে বললেন, ‘যখন কাটতে আসছিল, তখন চাপায়–চুপায়ে দেছে। আমরা ঘর বাঁচাতি পারিনি। শুধু টিনগুলো খুলে নিয়েছিলাম। এখন গরুর হাটের মাঠে আছি, ইজারাদারেরা উঠে যেতে বলে। এমপি পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছেন। ইউএনও একবার এসেছিলেন। পরে ডেকে নিয়ে ৩০ কেজি চাল দিয়েছেন। ওই শেষ।’ হাজেরার কথা শেষ হওয়ার আগেই আরও কয়েকজন এসে জড়ো হলেন। রাবেয়া বেগম নামের একজন বলেন, ‘আমাদের ঘর, বাথরুম কিছুই নেই। সব ভেঙে দিয়েছে। সবকিছু ভেঙেচুরে মাটির তলে। আমাদের কোনো আশ্রয় নেই। এখন কোনো পথ দেখছি না।’ নদী খননের মাটি ফেলায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে ঘর। আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে বহু পরিবার। চুকনগর, ডুমুরিয়া উপজেলা, খুলনা, ১৫ জুন চুকনগর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্প। আপার ভদ্রা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ওই আশ্রয়ণের ঘরের ওপরও মাটির স্তূপ জমেছে। সেখানে ১৩টি ঘরের ওপর এখন মাটির স্তূপ। কোনো ঘরের চাল ভেঙেছে, কোনো ঘরের দরজা-জানালা মাটিচাপা পড়েছে। আবার কোনোটির দেয়াল মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৩টি ঘরের বেশির ভাগেই এখন কেউ থাকছেন না। কাঁঠালতলা আশ্রয়ণের ক্ষতিগ্রস্ত ৭০ নম্বর ঘরের বাসিন্দা তানিয়া বেগম বলেন, ‘কোরবানির ঈদের পর এই অবস্থা হয়েছে। আগেও মাটির স্তূপ ছিল, তবে ঘরের এত ক্ষতি হয়নি। এখন টিনের চালে মাটি উঠে গেছে, বারান্দা ভেঙে পড়েছে। এখানে ১৩টি ঘরে কেউ কেউ আছে, কেউ কেউ অন্য জায়গায় চলে গেছে। এখন সরকার যদি সাহায্য করে, তা ছাড়া আর কী করব।’ চুকনগর ও কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশাপাশি বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পেরও ২৪টি ঘর মাটিচাপা পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি সেখানে ঘরের ওপর মাটি ফেলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শুক্লি বিবি চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পে থাকতেন। সেখানে ঘর মাটিচাপা পড়ায় কাঁঠালতলা আশ্রয়ণে মেয়ের ঘরে এসে উঠেছেন। তিনি বলেন, ‘চুকনগরে পাওয়া ঘরের সামনে শাকসবজি লাগিয়েছিলাম। ওখানে তো আর জায়গা নেই। আমার ঘর ভেঙে দিছে। কোনো চিহ্ন নেই। কাঁঠালতলায় জামাইয়ের বাড়ি আসছি। আমি এখানে থাকায় মেয়ের সংসারে অসুবিধা হচ্ছে।’ কাঁঠালতলা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প। সেখানেও ২৪টি ঘর মাটিচাপা পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি সেখানে ঘরের ওপর মাটি ফেলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গত সোমবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, মাটিচাপা পড়ে ২৪টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখান থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ নিজেরাই মাটি সরিয়ে ঘর বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামতের কাজও শুরু হয়েছে। নদী খননের মাটিতে চাপা পড়েছে আশ্রয়নের ঘর। সেই মাটি খুঁড়ে ইট বের করছেন পারুল বেগম। চুকনগর, ডুমুরিয়া উপজেলা, খুলনা, ১৫ জুন বরাতিয়া আশ্রয়ণের ৫৪ নম্বর ঘরের বাসিন্দা তপতী দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন-চার দিন আগে মাটি ঘরের ওপর ফেলা হয়েছে। আমাদের টয়লেট বন্ধ। কেউ টয়লেট ব্যবহার করতে পারছে না। মাটির চাপে ঘরের দরজা–জানালা খোলা যাচ্ছে না। চাল ভেঙে গেছে। ঘর এখন ঠিক করে দিচ্ছে; কিন্তু বাথরুমের কোনো ব্যবস্থা হয়নি।’ স্বামী রাশেদ শেখকে সঙ্গে নিয়ে পাশের ঘরের ভেতর থেকে মাটি সরাচ্ছিলেন তহমিনা খাতুন। তিনি বলেন, ‘দুই দিন ধরে মাটি সরাচ্ছি। দেখি কতক্ষণ লাগে। ঘরের চাল, বাথরুম সব ভেঙে গেছে। এখানকার কলটা মাটির নিচে ডুবে গেছে।’ আরেক বাসিন্দা আসমা বেগম বলেন, এখানে ৪৮টি ঘরের মধ্যে ২৪টির ক্ষতি হয়েছে। এই মাটি কিনেছেন শাহজাহান জমাদ্দার নামের এক ইটভাটার ব্যবসায়ী। তিনি সময়মতো মাটি সরাননি। সেই মাটির ওপর আবার মাটি ফেলায় এ অবস্থা হয়েছে। তবে শাহজাহান জমাদ্দারের মালিকানাধীন ইটভাটার ব্যবস্থাপক কৃষ্ণপদ মণ্ডল বলেন, নদী খননের মাটি কীভাবে কেনা হয়েছে, তা শাহজাহান জমাদ্দার জানেন। বরাতিয়া প্রকল্পের পাশের মাটি তাঁদের। সেখানকার মাটি সরানো হয়েছে। অল্প কিছু মাটি সরানো বাকি। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে সেনাবাহিনী ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, আগে মাটি সরানোর পরিবেশ ছিল না। এখানে জায়গা কম। এ জন্য মাটি সরাতে একটু সময় লেগেছে। বরাতিয়া প্রকল্পের একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখা গেল, ক্ষতিগ্রস্ত একটি ঘর মেরামতের কাজ চলছে। ঘরটি ইমন ধরের। তিনি বলেন, ‘চার-সাড়ে চার বছর ধরে এখানে আছি। গাঙ কাটার সময় এখানে মাটি পড়ে উঁচু ছিল। পরে আবার মাটি তুলেছে। তখন ঘরের ক্ষতি হয়েছে। এখন ঠিকাদারের লোক ঠিক করে দিচ্ছে।’ ঘর মেরামতের
📌 Kaynak
Bu haber XML kaynağından derlenmiştir. Tamamı için orijinal habere gidin.
Orijinal haberi oku →