পারমাণবিক বোমার ক্ষত কাটিয়ে শহরটি এখন শীর্ষ পর্যটন গন্তব্য
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক বোমায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল জাপানের নাগাসাকি শহর। এরপর শহরটি পুনর্গঠন করে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। সেই সঙ্গে শহরটি বারবার শান্তির আহ্বান জানিয়ে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ চুক্তিবিষয়ক এনপিটির বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন নাগাসাকির মেয়র সুজুকি শিরো। তবে আরও একটি কারণে এ বছর আলোচনায় এসেছে নাগাসাকি। সেটা হলো দেশি-বিদেশি পর্যটকের মনোযোগ কেড়েছে শহরটি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের নির্বা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক বোমায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল জাপানের নাগাসাকি শহর। এরপর শহরটি পুনর্গঠন করে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। সেই সঙ্গে শহরটি বারবার শান্তির আহ্বান জানিয়ে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ চুক্তিবিষয়ক এনপিটির বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন নাগাসাকির মেয়র সুজুকি শিরো। তবে আরও একটি কারণে এ বছর আলোচনায় এসেছে নাগাসাকি। সেটা হলো দেশি-বিদেশি পর্যটকের মনোযোগ কেড়েছে শহরটি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের নির্বাচিত ৫২টি বৈশ্বিক পর্যটন গন্তব্যের তালিকায় ১৭তম অবস্থানে রয়েছে নাগাসাকি। আর সংবাদমাধ্যমটির পাঠকদের শীর্ষ ১০ পর্যটন গন্তব্যের তালিকায় এ শহর পঞ্চম হয়েছে। এ উপলক্ষে ৮ জুন জাপানের রাজধানী টোকিওতে বিদেশি সাংবাদিকদের ক্লাব এফসিসিজেতে নাগাসাকির মেয়র সুজুকি শহরটির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প শোনান। উপস্থাপন করেন নাগাসাকির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক। ইতিহাসের ক্ষত ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার বিষয়টি সবারই জানা। তবে এ দুটি হামলার চরিত্র কিছুটা ভিন্ন ছিল বলে মন্তব্য করেন মেয়র সুজুকি। ওই বছরের ৬ আগস্ট হিরোশিমা শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে বোমা ফেলা হয়। সমতল শহরটি প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। অন্যদিকে ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে বোমা হামলার দিনটি ছিল মেঘলা। তাই বোমা গিয়ে পড়ে পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যস্থলের প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। নাগাসাকি একটি পাহাড়ি শহর। তাই শহরের একটি এলাকা বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেলেও শহরের কেন্দ্রস্থলসহ অন্যান্য এলাকায় ক্ষত কম ছিল। এর ফলে শহরটির বিভিন্ন অবকাঠামোর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো হামলার হাত থেকে রক্ষা পায় বলে জানান মেয়র। পর্যটক আকর্ষণে নাগাসাকির নতুন খাবার সাশি-সাবু মেয়র সুজুকি ওই সময়ে তাঁর পরিবারের অভিজ্ঞতার কথা সবাইকে জানান। তিনি বলেন, তাঁর মা–বাবা লক্ষ্যস্থলের খুব কাছাকাছি ছিলেন। মেঘলা আকাশের কারণে ভাগ্যক্রমে পরিবারের সদস্যরা বেঁচে গেলেও তাঁদের পারিবারিক কারখানা ধ্বংস হয়ে যায়। নাগাসাকির এ হামলায় প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ প্রাণ হারান, যা শহরটির তখনকার জনসংখ্যার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। যাঁরা বেঁচে গিয়েছিলেন, বিকিরণের সংস্পর্শে তাঁদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তী সময়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হন। বিকিরণের এই প্রভাব এত বছর পরও অব্যাহত আছে। অন্যদিকে এ ঘটনার কারণে সামাজিক বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে ‘হিবাকুশা’ নামে পরিচিত ভুক্তভোগীদের। বছরের পর বছর তাঁরা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক যন্ত্রণায়ও ভুগেছেন। ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নাগাসাকির বাসিন্দারা আণবিক বোমার কাছে নতি স্বীকার করেননি। ধ্বংসযজ্ঞ পেছনে ফেলে তাঁরা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। আট দশকের অক্লান্ত পরিশ্রমে নাগাসাকি এখন পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যে। এ পুনর্গঠন শুরু হয় হামলা–পরবর্তী সময় থেকেই। ওই বছরের অক্টোবরে সেখানকার ‘শুয়া মন্দিরে’ অনুষ্ঠিত হয় নাগাসাকি কুনচি উৎসব। বোমার আঘাতে নাগাসাকিতে জাপানের সবচেয়ে বড় উরাকামি ক্যাথেড্রালটি ধ্বংস হয়ে যায়। তবে গির্জার দুটি ঘণ্টার একটি উদ্ধার করা যায়। হামলার মাত্র চার মাস পর ক্রিসমাসের দিনে সেটি বাজানো হলে স্থানীয় খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। শহরবাসীও জীবন এগিয়ে নেওয়ার অনুপ্রেরণা পান। কেন শুধু পশ্চিমা পর্যটক, এশীয়দের ব্যাপারে কী আগ্রহ নেই? প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এমন প্রশ্নের জবাবে মেয়র সুজুকি বলেন, ‘অবশ্যই সবাইকে স্বাগত। তবে ইউরোপ ও আমেরিকার পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় এর ওপরই জোর দিচ্ছি আমরা এখন।’ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের পক্ষ থেকে গত বছর নাগাসাকির ওই ক্যাথেড্রালে আরেকটি ঘণ্টা উপহার দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে ৮০ বছরের বেশি সময় পর ঐতিহাসিক ক্যাথেড্রালটি পূর্ণতা পায়। ১৯৫৫ সালে হামলাস্থলে নির্মিত হয় শান্তি স্মারক ভাস্কর্য। এ মানবমূর্তি একাধারে পারমাণবিক হুমকি এবং শান্তির জন্য প্রার্থনার কথা মনে করিয়ে দেয়। এখন দুটি জায়গাই নাগাসাকির অন্যতম পর্যটন গন্তব্য। ঐতিহাসিক এই স্থাপনাগুলোর বাইরে বড় আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে নাগাসাকির বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিউইয়র্ক টাইমসের তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার অন্যতম কারণ নাগাসাকির অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। শহরটিতে রয়েছে সুনীল সমুদ্র, ব্যস্ত বন্দর আর সুউচ্চ পাহাড়। পাহাড়ের নিচ থেকে একেবারে চূড়া পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে ঘরবাড়ি। এগুলোর গঠনশৈলী বৈচিত্রপূর্ণ। নোবেলজয়ী সাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরোর লেখায় চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে এসবের নান্দনিকতা। এই মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি আর স্থাপত্যের পাশাপাশি নাগাসাকিতে আরও রয়েছে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান। এর মধ্যে অন্যতম হাশিমা দ্বীপ। জাপানের যুদ্ধ–পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে বড় ভূমিকা পালন করেছিল এখানকার কয়লাখনি। ছোট্ট এই দ্বীপে ছিল শ্রমিকদের বাড়িঘর, স্কুল, হাসপাতাল, এমনকি সিনেমা হল। ১৮৯০ সালে মিতসুবিসি কোম্পানি মাত্র ১ লাখ ইয়েনে দ্বীপটি কিনে নেয়। নিজেদের স্টিমনির্ভর জাহাজের প্রধান জ্বালানি কয়লার জোগান এখান থেকেই আসত। লেখকের সঙ্গে জাপানের নাগাসাকির মেয়র সুজুকি শিরো সমুদ্র ভরাট করে আয়তন বাড়িয়ে নেওয়া দ্বীপটি দূর থেকে দেখতে যেন একটি যুদ্ধজাহাজ। তাই এটি ‘গুনকানজিমা’ নামেও পরিচিত। জাপানি ভাষায় এর অর্থ যুদ্ধজাহাজ দ্বীপ। পরবর্তী সময়ে পেট্রোলিয়াম প্রধান জ্বালানিতে রূপান্তরের পর ১৯৭৪ সালে দ্বীপটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। জাপান সরকারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে ইউনেসকো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করে। দ্বীপটিতে সীমিতভাবে গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনন্য মিশ্র সংস্কৃতি প্রাকৃতিক আর ঐতিহ্যমণ্ডিত এসব জায়গার বাইরে নাগাসাকির আরেকটি আকর্ষণ হচ্ছে এর অনন্য সংস্কৃতি। সতেরো থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত তকুগাওয়া শোগুনের শাসনকালে জাপান বাকি বিশ্ব থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল নাগাসাকি। ওই সময় শহরটিতে নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন
📌 Kaynak
Bu haber XML kaynağından derlenmiştir. Tamamı için orijinal habere gidin.
Orijinal haberi oku →