রোনালদো কিংবা এক রোবটের গল্প
৪১ বছর বয়সে একজন ফুটবলারের ঠিকানা সাধারণত কোথায় হয়? স্মৃতির অ্যালবামে, ধারাভাষ্যকক্ষের আরামদায়ক চেয়ারে কিংবা ডাগআউটে কোটের বোতাম আঁটতে আঁটতে চিৎকার করা চরিত্রে। কিন্তু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তো আর সাধারণ কোনো নাম নয়। তিনি এক চিরযৌবনের উপাখ্যান। চলতি বিশ্বকাপেও পর্তুগাল দলের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম ‘সিআর সেভেন’। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কীভাবে এখনো সবুজ মাঠে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ছুটছেন এই মহাতারকা? ফুটবল–রোমান্টিকদের মনে এই প্রশ্ন জাগা খুব স্বাভাবিক। রোনালদোর ক্ষেত্রে সৌন্দর্যটা তাঁর
৪১ বছর বয়সে একজন ফুটবলারের ঠিকানা সাধারণত কোথায় হয়? স্মৃতির অ্যালবামে, ধারাভাষ্যকক্ষের আরামদায়ক চেয়ারে কিংবা ডাগআউটে কোটের বোতাম আঁটতে আঁটতে চিৎকার করা চরিত্রে। কিন্তু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তো আর সাধারণ কোনো নাম নয়। তিনি এক চিরযৌবনের উপাখ্যান। চলতি বিশ্বকাপেও পর্তুগাল দলের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম ‘সিআর সেভেন’। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কীভাবে এখনো সবুজ মাঠে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ছুটছেন এই মহাতারকা? ফুটবল–রোমান্টিকদের মনে এই প্রশ্ন জাগা খুব স্বাভাবিক। রোনালদোর ক্ষেত্রে সৌন্দর্যটা তাঁর ফুটবলে তো বটেই, তার চেয়েও বেশি তাঁর অতিমানবীয় লাইফস্টাইলে। রোনালদোর চিরসবুজ শরীরের রহস্য লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের এক অবিশ্বাস্য অঙ্কে এবং নিয়মের এক কঠোর শিকলে। তাঁর এই অতিমানবীয় ফিটনেসের নেপথ্য গল্পটা একটু বিশদেই জানা যাক। মাইনাস ১৩০ ডিগ্রির বরফঘর রোনালদোর ফিটনেস ধরে রাখার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার তাঁর নিজের বাড়ির এক বিশেষ ‘ক্রায়োথেরাপি চেম্বার’ বা বরফঘর। ২০১৩ সালে রিয়াল মাদ্রিদে খেলার সময় প্রায় ৪৫ হাজার ইউরো খরচ করে নিজের বাসায় এই কৃত্রিম বরফঘর বানিয়েছিলেন তিনি। আল-নাসরে যোগ দেওয়ার পরও নিয়মের হেরফের হয়নি। সৌদি আরবের রিয়াদের হোটেলেও তিনি এই ক্রায়োথেরাপির ব্যবস্থা রেখেছেন। এই চেম্বারের তাপমাত্রা সাধারণত মাইনাস ১১০ থেকে মাইনাস ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। প্রতি ম্যাচ বা কঠোর অনুশীলনের পর তরল নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ এই হিমশীতল ঠান্ডা ঘরে মাত্র তিন মিনিটের জন্য ঢুকে যান রোনালদো। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, এই চরম ঠান্ডা পেশির ক্লান্তি ও প্রদাহ নিমেষেই কমিয়ে দেয়। টুকরো ঘুম বা পলিফেজিক স্লিপ আমাদের মতো রাতে একনাগাড়ে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোর অভ্যাস রোনালদোর নেই। তিনি চলেন বিখ্যাত স্লিপ কোচ নিক লিটলহেলসের পরামর্শে। নিক তাঁর স্লিপ বইতে খেলোয়াড়দের একনাগাড়ে না ঘুমিয়ে ৯০ মিনিটের সাইকেলে ঘুমানোর পরামর্শ দিয়েছেন, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘পলিফেজিক স্লিপ’। রোনালদো দিনে ও রাতে মিলিয়ে ৯০ মিনিটের এমন ৫ থেকে ৬টি টুকরো ঘুম বা ‘ন্যাপ’ নেন। মানবদেহের স্বাভাবিক ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা শরীরের ভেতরের ঘড়ি অনুযায়ী, একটি পূর্ণাঙ্গ ঘুমচক্র শেষ হতে ঠিক ৯০ মিনিট সময় লাগে। নিজের সাবেক শেফ জর্জিও বারোনের (বাঁয়ে) সঙ্গে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো রাতের ঘুমের ঘাটতি মেটাতে বা ম্যাচের পর পেশি সতেজ করতে রোনালদোর এই কৌশলগত ঘুম দারুণ কার্যকর। তবে একটা নিয়ম এখানে খুব কড়া—বিছানায় শোয়ার পর ফোন, টিভি বা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। খাদ্যতালিকায় কড়া শাসন ভারতের সাংবাদিক ও লেখক গৌতম ভট্টাচার্য একবার লিখেছিলেন, জিনিয়াসদের খাওয়াদাওয়ার মধ্যেও একটা অদ্ভুত পাগলামি থাকে। রোনালদোর পাগলামিটা স্বাস্থ্যের পক্ষে। অতিরিক্ত চিনি, সফট ড্রিংকস ও প্রক্রিয়াজাত খাবার তাঁর ডিকশনারিতেই নেই। ২০২০ ইউরো কাপের সেই বিখ্যাত সংবাদ সম্মেলনে কোকা-কোলার বোতল সরিয়ে পানি পানের পরামর্শ দেওয়ার ঘটনা তো আজ বিশ্ববিদিত। ভালোত্তোলনে অনেকটা সময় কাটে এই তারকার তিনি দিনে ছয়বার অল্প অল্প করে খাবার খান। তাঁর পাতের সিংহভাগজুড়ে থাকে তাজা মাছ, বিশেষ করে সোর্ডফিশ, সি-বাস, কডফিশ এবং প্রচুর পরিমাণের সালাদ। প্রক্রিয়াজাত বা ফ্রোজেন খাবার তিনি ছুঁয়েও দেখেন না। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে রোনালদোর সাবেক সতীর্থ প্যাট্রিস এভরা একবার মজা করে বলেছিলেন, ‘রোনালদো যদি কখনো আপনাকে তাঁর বাসায় দুপুরের খাবারের দাওয়াত দেয়, তবে ভুলেও যাবেন না! কারণ, ও টেবিলে শুধু সেদ্ধ মুরগির বুকের মাংস, সালাদ আর পানি দেয়।’ পানির নিচে জিম ও উল্টো ঝুলে থাকা পায়ের পেশি ও হাঁটুর জয়েন্টকে দীর্ঘস্থায়ী করতে রোনালদো পানির নিচে বিশেষ ‘হাইড্রোথেরাপি জিম’ ব্যবহার করেন। ইনজুরির ঝুঁকি ও শরীরের জয়েন্টের ওপর চাপ কমাতে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি, যার ছবি ও ভিডিও রোনালদো নিজেই বহুবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন। এর পাশাপাশি রয়েছে ‘ইনভারশন থেরাপি’। একটি বিশেষ টেবিলের সাহায্যে শরীরকে পুরোপুরি উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। লৌহকঠিন মানসিকতা সব থেরাপি বা বিজ্ঞানের চেয়েও রোনালদোর আসল শক্তি তাঁর মন। স্পোর্টস সাইকোলজিস্টরা তাঁর এই মানসিক দৃঢ়তাকে বলেন ‘এলিট মেন্টালিটি’। যখন তাঁর সমসাময়িক ফুটবলাররা বুটজোড়া তুলে রেখে ধারাভাষ্য দিচ্ছেন, রোনালদো তখনো প্রতিটি গোলের জন্য ওত পেতে থাকেন। চারপাশের সমালোচনাকে তিনি ছুড়ে ফেলেন না, বরং সেটিকে বানান নিজের এগিয়ে যাওয়ার জ্বালানি। প্রতিটি ম্যাচে নামার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলেন, ‘আমিই সেরা।’ রোনালদোর শরীরকে দেখে অনেক সময় মনে হতে পারে, তিনি আসলে মানুষ নন, নিখুঁতভাবে প্রোগ্রাম করা এক রোবট। কিন্তু রক্ত-মাংসের এই শরীরের পেছনে আসলে অলৌকিক কিছু নেই। যা আছে, তা হলো বছরের পর বছর ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার এক অবিশ্বাস্য অভ্যাস ও আত্মশৃঙ্খলা। ‘লাকি সিক্সে’ ভাগ্য ফিরবে কি রোনালদোর পর্তুগালের
📌 Kaynak
Bu haber XML kaynağından derlenmiştir. Tamamı için orijinal habere gidin.
Orijinal haberi oku →