খুঁজতে গিয়েছিলাম ছবি, ফিরে এলাম গল্প নিয়ে
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা সেদিন ভোর থেকেই ছিল ব্যস্ততা। হাতে অনেক কাজ, এরই মধ্যে জরুরি একটি মিটিংয়ে যোগ দিতে সকাল সকাল বের হয়ে যাই। সঙ্গে ছিলেন প্রিয় ভাই আল-ফাতাহ মামুন। মিটিং শেষে যখন বের হলাম, ঘড়ির কাঁটা প্রায় ১১টার ঘরে। দুজনই বেশ ক্ষুধার্ত। মতিঝিলের কাছের একটি রেস্টুরেন্টে বসে সকালের খাবার খেতে খেতে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলছি। একপর্যায়ে মামুন ভাই বললেন, তাঁর ল্যাপটপটি হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেছে। আমি নিজের কাজের চিন্তায় এতটাই ডুবে ছিলাম যে উত্তর না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলাম। খাওয়
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা সেদিন ভোর থেকেই ছিল ব্যস্ততা। হাতে অনেক কাজ, এরই মধ্যে জরুরি একটি মিটিংয়ে যোগ দিতে সকাল সকাল বের হয়ে যাই। সঙ্গে ছিলেন প্রিয় ভাই আল-ফাতাহ মামুন। মিটিং শেষে যখন বের হলাম, ঘড়ির কাঁটা প্রায় ১১টার ঘরে। দুজনই বেশ ক্ষুধার্ত। মতিঝিলের কাছের একটি রেস্টুরেন্টে বসে সকালের খাবার খেতে খেতে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলছি। একপর্যায়ে মামুন ভাই বললেন, তাঁর ল্যাপটপটি হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেছে। আমি নিজের কাজের চিন্তায় এতটাই ডুবে ছিলাম যে উত্তর না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলাম। খাওয়া শেষ করে বাসার দিকে রওনা দিলাম। ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মামুন ভাইয়ের কথাটা মনে পড়ল। ফোন দিলাম, কথা বললাম, তারপর অনলাইনে একটি ল্যাপটপের খোঁজ শুরু করলাম। খুব বেশি সময় লাগল না। একটি ভালো ল্যাপটপের সন্ধান পেয়ে গেলাম। বিক্রেতার অফিস কমলাপুর রেলস্টেশনের উল্টো পাশে। অনেক বছর পর সেদিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো। ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা রিকশা রেলস্টেশনের সামনে নামিয়ে দিয়ে বলল, সামনে রাস্তা বন্ধ। ভাড়া মিটিয়ে যখন নামলাম, চোখের সামনে যে দৃশ্যটি ভেসে উঠল, তা আমাকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করল। চারদিকে যেন মানুষের সমুদ্র! কেউ স্টেশন থেকে বের হচ্ছে, কেউ ভেতরে ঢুকছে। কারও মুখে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি, কারও চোখে প্রিয়জনের কাছে ফেরার আনন্দ। কেউ সিএনজি খুঁজছে, কেউ রিকশাওয়ালার সঙ্গে দরদাম করছে। ব্যস্ততা, শব্দ আর মানুষের চলাচলে পুরো এলাকা যেন জীবন্ত এক ক্যানভাসে পরিণত হয়। ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানুষগুলোকে দেখছিলাম। একজন ফটোগ্রাফারের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলোর একটি হলো মানুষের গল্প। প্রতিটি মুখের পেছনে থাকে আলাদা জীবন, আলাদা সংগ্রাম, আলাদা স্বপ্ন। আফসোস করছিলাম, ক্যামেরাটা যদি সঙ্গে থাকত! ল্যাপটপ কেনা হলো, মামুন ভাইকে দেওয়া হলো, কাজও শেষ হয়ে গেল; কিন্তু কমলাপুরের সেই দৃশ্যগুলো যেন মাথার ভেতর বাসা বেঁধে রইল। বাড়ি ফিরে আসার পরও বারবার মনে হচ্ছিল, এই জায়গায় আবার আসতে হবে। তবে এবার কাজের জন্য নয়, মানুষের গল্প খুঁজতে। সঙ্গে থাকবে ক্যামেরা। ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা দিন কয়েক কেটে গেল। ১২ জুন রাতে সিদ্ধান্ত নিলাম, পরদিন সকালে ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে কমলাপুরে চলে যাব। মানুষের জীবন, অপেক্ষা আর যাত্রার মুহূর্তগুলোকে ফ্রেমবন্দী করার চেষ্টা করব। কিন্তু প্রকৃতির যেন অন্য পরিকল্পনা। সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি আকাশ কালো হয়ে আছে। শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। বজ্রপাত আর মেঘের গর্জনে পুরো শহর কাঁপছে। অপেক্ষা করতে লাগলাম। সময় গড়াতে লাগল আর বৃষ্টি ধীরে ধীরে কমতে কমতে বিকেল চারটা বেজে গেল। ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা অবশেষে ক্যামেরার ব্যাগ কাঁধে তুলে বেরিয়ে পড়লাম। কমলাপুর পৌঁছে প্রথমেই ছোট্ট একটি সমস্যায় পড়লাম। রিকশার ভাড়া দিতে গিয়ে দেখি, মানিব্যাগে ভাংতি নেই। রিকশাওয়ালার কাছেও নেই। শেষে যা ছিল, তা দিয়েই কোনোভাবে হিসাব মিটিয়ে নিলাম। এরপর স্টেশনের প্রবেশপথে গিয়ে জানতে পারলাম, প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে টিকিট প্রয়োজন। টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। টিকিটের দাম মাত্র ১০ টাকা। কিন্তু আমার কাছে ছিল শুধু বড় নোট। কাউন্টারে থাকা ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বললাম, ছবি তুলতে এসেছি। ভাংতি নেই। ভদ্রমহিলা কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর টিকিটটা হাতে দিয়ে বললেন, ‘ফেরার সময় দিয়ে যাবেন, নয়তো এই টাকাটা আমার দিতে হবে।’ ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা কথাটা শুনে অদ্ভুত অনুভূতি হলো। এই শহরকে আমরা প্রায়ই কঠিন, ব্যস্ত আর হিসাবি বলে মনে করি। কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হলো, এখনো কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের কারণে পৃথিবীটা পুরোপুরি কঠিন হয়ে যায়নি। এখনো কিছু বিশ্বাস বেঁচে আছে, কিছু আন্তরিকতা বেঁচে আছে। ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা টিকিট হাতে প্ল্যাটফর্মে ঢুকতেই একটি ট্রেন এসে থামল। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের দৃশ্য বদলে গেল। ট্রেন থেকে নামা আর ওঠা মানুষের ভিড়ে প্ল্যাটফর্ম যেন হঠাৎ প্রাণ ফিরে পেল। কেউ দ্রুত হাঁটছে, যেন সময়কে হারিয়ে দিতে চায়। কেউ ধীরে ধীরে নামছে, দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি নিয়ে। কারও হাতে ভারী ব্যাগ, কারও কাঁধে জীবনের দায়দায়িত্ব। চারপাশের সবকিছু দেখছিলাম আর মনে হচ্ছিল, আমরা সবাই আসলে একেকজন যাত্রী। আমাদের গন্তব্য আলাদা হতে পারে; কিন্তু অপেক্ষা, স্বপ্ন, অনিশ্চয়তা আর প্রত্যাশার জায়গাগুলো খুব বেশি ভিন্ন নয়। ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা একটি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত মানুষের প্রত্যেকের গল্প আলাদা। কেউ প্রিয়জনের কাছে ফিরছে, কেউ কর্মস্থলে যাচ্ছে, কেউ নতুন জীবন শুরু করতে বেরিয়েছে, কেউ হয়তো দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফিরছে। আবার কেউ হয়তো বিদায়ের শেষ মুহূর্তটুকু বুকের ভেতর জমিয়ে রাখছে। সেই মানুষগুলোর ভিড়ের মাঝখানে ক্যামেরা হাতে হাঁটতে লাগলাম। কেউ ট্রেনের জানালার পাশে বসে হাসছে, কেউ নিজের বগি খুঁজে বেড়াচ্ছে, কেউ পরিবারের সঙ্গে গল্প করছে, আবার কেউ নীরবে দূরে তাকিয়ে আছে। আমি একের পর এক ছবি তুলতে লাগলাম। ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা মনে হচ্ছিল, ছবি তুলছি না; বরং সময়কে থামিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। কারণ, কয়েক মুহূর্ত পর সবকিছু বদলে যাবে। ট্রেন ছেড়ে যাবে, মানুষ হারিয়ে যাবে ভিড়ের মধ্যে, হাসি মিশে যাবে শহরের কোলাহলে, অপেক্ষা শেষ হবে, আবার নতুন কোনো অপেক্ষা শুরু হবে। কিন্তু ক্যামেরার ছোট্ট ফ্রেমের ভেতরে সেই মুহূর্তগুলো বেঁচে থাকবে। ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা হয়তো বহু বছর পর কোনো একদিন আবার সেই ছবিগুলোর দিকে তাকাব। তখন হয়তো ছবির মানুষগুলোর নাম মনে থাকবে না, তাদের গন্তব্যও জানা থাকবে না। কিন্তু ছবিগুলো আমাকে মনে করিয়ে দেবে, এক বিকেলে কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। দেখেছিলাম অপেক্ষা, স্বপ্ন, বিদায়, পুনর্মিলন আর চলমান জীবনের অসংখ্য গল্প। ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা সেদিন কমলাপুরে ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসেছিলাম আরও অনেক কিছু নিয়ে। কিছু মুখ, কিছু
📌 Kaynak
Bu haber XML kaynağından derlenmiştir. Tamamı için orijinal habere gidin.
Orijinal haberi oku →