কারবালা-ট্র্যাজেডি যেভাবে বদলে দেয় আরবের ভূরাজনীতি
৬১ হিজরির ১০ মহররম, ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে সপরিবারে শাহাদাত বরণ করেন মহানবীর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)। মুসলিম বিশ্বে এই ঘটনা আজও গভীর শোক ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তবে ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে, কারবালার ঘটনা কেবল একটি পারিবারিক শোকগাথা ছিল না। এটি উমাইয়া খেলাফতের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল, আরবের ভেতরে পুরোনো গোত্রীয় বিভেদ উসকে দিয়েছিল এবং পরবর্তী কয়েক দশকে একাধিক রাজনৈতিক রূপান্তরের পথ তৈরি করেছিল। উমাইয়া শাসনে বৈধতার সংকট মুয়াবিয়া (রা.)-এ
৬১ হিজরির ১০ মহররম, ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে সপরিবারে শাহাদাত বরণ করেন মহানবীর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)। মুসলিম বিশ্বে এই ঘটনা আজও গভীর শোক ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তবে ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে, কারবালার ঘটনা কেবল একটি পারিবারিক শোকগাথা ছিল না। এটি উমাইয়া খেলাফতের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল, আরবের ভেতরে পুরোনো গোত্রীয় বিভেদ উসকে দিয়েছিল এবং পরবর্তী কয়েক দশকে একাধিক রাজনৈতিক রূপান্তরের পথ তৈরি করেছিল। উমাইয়া শাসনে বৈধতার সংকট মুয়াবিয়া (রা.)-এর পর তাঁর পুত্র ইয়াজিদের ক্ষমতারোহণ আরবের রাজনৈতিক ইতিহাসে বংশানুক্রমিক শাসনের সূচনা করে। ইমাম হোসাইন (রা.) এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নৈতিক অবস্থান নিয়েছিলেন। মদিনাবাসীরা ইয়াজিদের আনুগত্য অস্বীকার করে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, যা ইতিহাসে হাররার যুদ্ধ নামে পরিচিত। উমাইয়ারা বিদ্রোহ দমন করতে পারলেও এই ঘটনা তাদের নৈতিক ভাবমূর্তিকে আরও দুর্বল করে দেয়। কারবালার হত্যাকাণ্ডের পর নবীপরিবারের প্রতি এই নিষ্ঠুরতা সাধারণ মুসলিমদের মনে ক্ষোভ তৈরি করে এবং উমাইয়া শাসন একটি গভীর বৈধতার সংকটে পড়ে। এর প্রথম প্রকাশ্য বহিঃপ্রকাশ ঘটে মদিনায়। মদিনাবাসীরা ইয়াজিদের আনুগত্য অস্বীকার করে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, যা ইতিহাসে হাররার যুদ্ধ নামে পরিচিত। উমাইয়ারা বিদ্রোহ দমন করতে পারলেও এই ঘটনা তাদের নৈতিক ভাবমূর্তিকে আরও দুর্বল করে দেয়। (আকবর শাহ খান নাজিবাবাদি, তারিখুল ইসলাম, ২/১১৫, দারে ইহয়া আত-তুরাস আল আরবি, বৈরুত, ১৯৯৭) মক্কা–মদিনার রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কারবালার পরবর্তী সময়ে আরবের ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে হিজাজ অঞ্চলে। আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) ইয়াজিদের শাসনকে অবৈধ ঘোষণা করে মক্কায় নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। কারবালার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উমাইয়াবিরোধী মনোভাব তৈরি করেছিল, তা তাঁর পক্ষে হিজাজ, ইয়েমেন ও ইরাকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন আদায় করতে সহায়ক হয়। কারবালা, আশুরা এবং সাহাবিদের দ্বিমত থেকে শিক্ষা এর ফলে আরবের ভূরাজনৈতিক কাঠামো কার্যত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে—একদিকে দামেস্কের উমাইয়া শাসন, অন্যদিকে মক্কাকেন্দ্রিক জুবাইরীয় নেতৃত্ব (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮/২৫১, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৮)। কুফা ও তাওওয়াবুন আন্দোলন কারবালার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছিল ইরাকের কুফায়। কুফাবাসীরা ইমাম হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, কিন্তু উমাইয়া গভর্নর ইবনে জিয়াদের চাপে তাঁরা শেষ পর্যন্ত তাঁকে সাহায্য করতে পারেননি। এই অনুশোচনা থেকে কুফায় ‘তাওওয়াবুন’ বা অনুশোচনাকারীদের আন্দোলন গড়ে ওঠে। সোলাইমান ইবনে সুরদ আল-খুজায়ির নেতৃত্বে উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন সংঘটিত হলেও সামরিকভাবে তা সফল হয়নি। (ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৩/৩৬২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৭) উমাইয়া শাসনের একটি মূল ভিত্তি ছিল আরবীয় গোত্রীয় সমর্থন। কিন্তু কারবালা-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ‘কালব’ ও ‘কায়েস’—এই দুই প্রধান গোত্রীয় জোটের মধ্যে পুরোনো শত্রুতা নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। আন্দোলনটি ব্যর্থ হলেও ইরাক অঞ্চলে উমাইয়াবিরোধী রাজনৈতিক চেতনাকে স্থায়ী রূপ দিয়ে যায়। এর পর থেকে ইরাক উমাইয়া শাসনের জন্য একটি ক্রমাগত অস্থির অঞ্চলে পরিণত হয়। অনারবদের রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি তাওয়াবুন আন্দোলনের পর কুফায় মোখতার আল-সাকাফির উত্থান ঘটে। মুখতার কারবালার জনমানসিক আবেগকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হন। তাঁর শাসনকালের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ‘মাওয়ালি’ বা অনারব মুসলিমদের—বিশেষত পারসিকদের—সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া। উমাইয়া শাসনে এই শ্রেণি ব্যাপকভাবে বৈষম্যের শিকার হতো। মোখতারের এই পদক্ষেপ আরব-অনারব বিভেদের প্রশ্নটিকে রাজনৈতিক কেন্দ্রে নিয়ে আসে এবং পারস্যের জনগণকে উমাইয়াবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। (ড. মুহাম্মদ সোহাইল তাক্কুশ, তারিখুল উমুবিইয়্যিন, ১/৮৭, দারুন নাফায়িস, বৈরুত, ১৯৯৫) মদিনা থেকে কারবালা গোত্রীয় দ্বন্দ্বের পুনরুত্থান উমাইয়া শাসনের একটি মূল ভিত্তি ছিল আরবীয় গোত্রীয় সমর্থন। কিন্তু কারবালা-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ‘কালব’ ও ‘কায়েস’—এই দুই প্রধান গোত্রীয় জোটের মধ্যে পুরোনো শত্রুতা নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ৬৪ হিজরিতে মার্জ রাহিতের যুদ্ধে এই দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘাত উমাইয়াদের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। (তাবারি, তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক, ৫/৫৩৬, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৬৭) কারবালার পর উমাইয়াদের যে বৈধতার সংকট শুরু হয়েছিল, সেই পটভূমিতে এই গোত্রীয় বিভেদ অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। আব্বাসীয়রা তাদের আন্দোলনের মূল স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেছিল নবী-পরিবারের অধিকার পুনরুদ্ধারের দাবিকে। খোরাসান অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া এই বিপ্লবে অনারব মুসলিমদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। আব্বাসীয় বিপ্লব, উমাইয়াদের পতন কারবালা-পরবর্তী দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিণতি হিসেবে আসে ১৩২ হিজরিতে আব্বাসীয় বিপ্লব। আব্বাসীয়রা তাদের আন্দোলনের মূল স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেছিল নবী-পরিবারের অধিকার পুনরুদ্ধারের দাবিকে। খোরাসান অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া এই বিপ্লবে অনারব মুসলিমদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল—যে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির ধারণা মোখতার সাকাফি প্রথম সূচনা করেছিলেন। জাব নদীর যুদ্ধে উমাইয়াদের চূড়ান্ত পরাজয় এবং বাগদাদে আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সমাপ্ত হয়। (ড. হাসান ইব্রাহিম হাসান, ইসলামের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২/৪৩, মাকতাবাতুন নাহদাতিল মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯৬৪) মোটকথা, কারবালার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ছিল দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুমাত্রিক। মক্কা-মদিনার বিচ্ছিন্নতা, কুফার প্রতিরোধ, অ
📌 Kaynak
Bu haber XML kaynağından derlenmiştir. Tamamı için orijinal habere gidin.
Orijinal haberi oku →