মুখের একটি বাক্য কীভাবে অন্যের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিচ্ছে
কথা একটি অসাধারণ শক্তি। একটি স্নেহের বাক্য একজন মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে, তাঁকে সম্মানের উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। আবার একটি অবমাননাকর, বিদ্রূপাত্মক বা ঘৃণাভরা বাক্য একজন মানুষের আত্মসম্মান, আত্মপরিচয় ও বেঁচে থাকার শক্তিকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিতে পারে। সেদিন ‘মাইকেল জ্যাকসন’ মুভিটি দেখছিলাম। মাইকেল জ্যাকসনকে পপজগতের সম্রাট বলা হয়। তাঁর বাবা জো জ্যাকসন অত্যন্ত কঠোর ও অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে তাঁর শৈশবের অভিজ্ঞতায় কিছু কটূক্তির কথা উঠে এসেছে। যেমন— ‘তোমার
কথা একটি অসাধারণ শক্তি। একটি স্নেহের বাক্য একজন মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে, তাঁকে সম্মানের উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। আবার একটি অবমাননাকর, বিদ্রূপাত্মক বা ঘৃণাভরা বাক্য একজন মানুষের আত্মসম্মান, আত্মপরিচয় ও বেঁচে থাকার শক্তিকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিতে পারে। সেদিন ‘মাইকেল জ্যাকসন’ মুভিটি দেখছিলাম। মাইকেল জ্যাকসনকে পপজগতের সম্রাট বলা হয়। তাঁর বাবা জো জ্যাকসন অত্যন্ত কঠোর ও অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে তাঁর শৈশবের অভিজ্ঞতায় কিছু কটূক্তির কথা উঠে এসেছে। যেমন— ‘তোমার নাকটা খুব বড়/ কুৎসিত’, ‘তুমি কিছুই ঠিকমতো করতে পারো না’, ‘তুমি যথেষ্ট ভালো নও’ ইত্যাদি। ছোটবেলা থেকে চেহারা নিয়ে এ ধরনের অপমান তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল এবং পরবর্তী সময়ে যা তাঁর আত্মবিশ্বাসের ওপর প্রভাব ফেলে। পারফরম্যান্সে সামান্য ভুল হলেও কঠোর সমালোচনা ও অপমান তাঁর মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করত। এর প্রভাব এত ছিল যে মঞ্চে ওঠার আগে সে নিজেকে কয়েকটা অ্যাফার্মেশন দিয়ে তারপর মঞ্চে উঠতেন। মুভিটি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম এবং অনুভব করছিলাম, নেতিবাচক কথা একটা মানুষের মধ্যে কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর হাত-পা কাঁপছে এবং তিনি বিড়বিড় করে বলছেন নিজেকে— ‘ইউ আর আ স্টার’ ‘ইউ আর দ্য বেস্ট’ ‘বিলিভ ইন ইউর সেল্ফ’ ‘দ্য অডিয়েন্স লাভস ইউ’ ‘ইউ ক্যান ডু ইট’ জানালার আলোছায়া আর আমাদের ভেতরের পৃথিবী মাইকেল জ্যাকসন নিজেকে খুব একা মনে করতেন। কখনই মনে করতেন না যে তিনি প্রেজেন্টেবল। তাঁর ভেতরে গভীর এক ব্যথা বাস করত; হয়তো ব্যথা নিয়ে তিনি দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। আজ ১৮ জুন, বিশ্বব্যাপী হেট স্পিচ প্রতিরোধ দিবস। এটি জাতিসংঘ ঘোষিত একটি আন্তর্জাতিক দিবস। এই দিবসের উদ্দেশ্য—ঘৃণামূলক বক্তব্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, অনলাইন ও অফলাইনে বিদ্বেষ, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধকে উৎসাহিত করা। মানুষ পৃথিবীতে আসে একটি শব্দের মধ্য দিয়ে, কান্নার শব্দে। জীবনের শেষ বিদায়েও থেকে যায় কিছু কথা, কিছু স্মৃতি, কিছু উচ্চারণ। অর্থাৎ, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের জীবন শব্দ ও কথার সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে। সমাজে শারীরিক সহিংসতাকে আমরা সহজেই চিহ্নিত করতে পারি। কারণ, তার ক্ষত চোখে দেখা যায়। কিন্তু কথার আঘাতের ক্ষত অদৃশ্য। তাই অনেক সময় আমরা এর ভয়াবহতাকে গুরুত্ব দিই না। পেশাগত জীবনে অসংখ্য মানুষকে বলতে শুনেছি— ‘সে কখনো আমার গায়ে হাত তোলে না, কিন্তু তার প্রতিটি কথা আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। প্রতিদিন মনে হয়, আমি আর আগের মানুষটি নেই।’ ধরা যাক, একজন নারী প্রতিদিন তাঁর জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে শুনছেন, ‘তুমি কোনো কাজের নও’, ‘তোমার কোনো মূল্য নেই’, ‘তোমাকে ছাড়া আমার জীবন আরও ভালো হতো।’ প্রথম দিকে হয়তো তিনি ভাবলেন, রাগের মাথায় বলা কিছু কথা। কিন্তু যখন এই কথাগুলো বছরের পর বছর চলতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে তিনি নিজের সক্ষমতা নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করেন। আত্মবিশ্বাস কমে যায়, উদ্বেগ বাড়ে, বিষণ্নতা তৈরি হয়। আবার একজন কিশোরকে ভাবুন; যে বন্ধুদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত তার চেহারা, শরীর বা কোনো দুর্বলতা নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য শুনছে। বাইরে থেকে এটি ‘মজা’ বলে মনে হতে পারে; কিন্তু তার ভেতরে জন্ম নিতে পারে লজ্জাবোধ, একাকিত্ব, সামাজিক ভয় এবং নিজেকে অযোগ্য মনে করার প্রবণতা। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বারবার নেতিবাচক, অপমানজনক বা ঘৃণামূলক ভাষা শোনার অভিজ্ঞতা একজন মানুষের মানসিক নিরাপত্তাবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে থাকলে মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, আত্মসম্মানহীনতা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং সম্পর্কের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হয়। অনেক সময় মানুষ সেই নেতিবাচক কথাগুলো নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। যেমন ‘আমি অযোগ্য’, ‘আমি ভালোবাসার যোগ্য নই’, ‘আমার কোনো মূল্য নেই’। এই নেতিবাচক বিশ্বাস তার জীবন, সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্ককেও প্রভাবিত করতে পারে। হেট স্পিচ বা ঘৃণামূলক বক্তব্য এমন একটি ভাষা, যা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয়, বিশ্বাস, লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয়, শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা অন্য কোনো বৈশিষ্ট্যকে লক্ষ্য করে তাকে হেয়, অপমান বা মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে। বারবার ঘৃণামূলক ভাষার মুখোমুখি হওয়া মানুষের মধ্যে ভয়, ক্ষোভ, অসহায়ত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। এটি একজন মানুষকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি পুরো সমাজের সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিকেও দুর্বল করে। তৈরি হতে পারে তার মধ্যে আক্রমণাত্বক এক চিন্তাধারা; যা আমাকে, আপনাকে, গোটা সমাজকে ধ্বংস করে দিতে পারে। চলুন, আজকে থেকে আমরা আমাদের প্রতিদিনের ভাষাকে সচেতনতার সঙ্গে ব্যবহার করি। • কথা বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করি, আমার এই কথা কি কাউকে আঘাত করবে? • মতের অমিলকে ঘৃণায় নয়, সম্মানজনক সংলাপে রূপ দিই। • পরিবারের শিশুদের শেখাই, কঠিন সত্যও কীভাবে সম্মানের সঙ্গে বলা যায়। • কোনো ব্যক্তি যদি বারবার অপমানজনক ভাষার শিকার হন, তবে তাঁকে ‘সহ্য করো’ না বলে তাঁর অনুভূতিকে গুরুত্ব দিই। কীভাবে সে প্রকাশ করতে পারে, তাঁকে সাহায্য করি, সহমর্মিতা দিয়ে দেখি। সাইকোথেরাপিস্ট ও মানসিক–বিষয়ক প্রশিক্ষক, কনসালট্যান্ট, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ
📌 Kaynak
Bu haber XML kaynağından derlenmiştir. Tamamı için orijinal habere gidin.
Orijinal haberi oku →