জাতীয়তাবাদ যেভাবে বিদেশি মাতবরির বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে
আজকের বিশ্বরাজনীতি নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। বলা হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন চলছে, তা মূলত বিশ্বায়ন ও উদার গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের অসন্তোষের ফল। এই অসন্তোষ থেকেই নাকি জাতিগত জাতীয়তাবাদ ও কিছুটা স্বৈরাচারী প্রবণতা জোর পাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা এতটা সরল নয়। মানুষ শুধু রাগ বা ভয় থেকে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না; বরং অর্থনৈতিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত অস্থিরতা, সাংস্কৃতিক উদ্বেগ, জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন—এসব মিলিয়েই তাদের অবস্থান তৈরি হচ্ছে। ফলে একই সঙ্
আজকের বিশ্বরাজনীতি নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। বলা হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন চলছে, তা মূলত বিশ্বায়ন ও উদার গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের অসন্তোষের ফল। এই অসন্তোষ থেকেই নাকি জাতিগত জাতীয়তাবাদ ও কিছুটা স্বৈরাচারী প্রবণতা জোর পাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা এতটা সরল নয়। মানুষ শুধু রাগ বা ভয় থেকে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না; বরং অর্থনৈতিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত অস্থিরতা, সাংস্কৃতিক উদ্বেগ, জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন—এসব মিলিয়েই তাদের অবস্থান তৈরি হচ্ছে। ফলে একই সঙ্গে কোথাও জাতীয়তাবাদ বাড়ছে, আবার কোথাও মানুষ গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে রক্ষা করতেও এগিয়ে আসছে। প্রযুক্তি ও অর্থনীতির দ্রুত বদলের এই সময়ে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অতীতের দিকে ফিরে তাকায়। এই অতীত চেতনা বা নস্টালজিয়া কখনো জাতিগত জাতীয়তাবাদীদের শক্তি জোগায়, আবার কখনো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা যায়, কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘দেশের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা’র প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দুবার ক্ষমতায় আসতে পেরেছেন। একদিকে তিনি নিজেকে বিশ্বায়নের বিরোধী হিসেবে তুলে ধরেন, অন্যদিকে সারা পৃথিবীতে নানা চুক্তি করতে থাকেন—এই দ্বৈত আচরণ অনেককে বিভ্রান্ত করে। এই ধাঁধার সূত্র খুঁজতে গেলে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দিকে তাকাতে হয়। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে এই অঞ্চল এক বিশাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। সেটি ছিল বিংশ শতাব্দীর শেষের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভূমিকম্পগুলোর একটি। তখন মানুষ উদারনীতি, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ—এই তিনের মিশ্র ধারণাকে সামনে রেখে সোভিয়েত আমলের আন্তর্জাতিক কমিউনিজমকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ছোট ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি হিসেবে যৌথ ইতিহাসকে সামনে আনছে। এই ইতিহাসই তাদের এমন এক শক্তি দিচ্ছে, যার সাহায্যে তারা বিদেশি জাতীয়তাবাদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের মোকাবিলা করতে পারছে। আজ আবার সেই অঞ্চলই নতুন এক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এখানে জাতীয়তাবাদ এখন শুধু স্বৈরাচারের বিরুদ্ধেই নয়, বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধেও দাঁড়াচ্ছে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট দুটি উদাহরণ হলো—হাঙ্গেরির নির্বাচনে ভিক্তর অরবানকে হারিয়ে পেতের মাগিয়ারের জয় এবং আলবেনিয়ায় সাজান দ্বীপকে বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরের ট্রাম্প পরিবারের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে জনতার প্রতিবাদ। মাগিয়ারের জয়ের পেছনে অনেক কারণ থাকলেও তিনি জাতীয় পরিচয়, দুর্নীতি ও বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়গুলোকে জোর দিয়ে সামনে এনেছিলেন। ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, টাকার কার্লসনসহ ডানপন্থী মার্কিন নেতারা হাঙ্গেরিকে ব্যবহার করে ‘মাগা’ আন্দোলনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও ছিল স্পষ্ট। নির্বাচনের আগের দিন হাঙ্গেরির মানুষ ১৯৫৬ সালের সোভিয়েতবিরোধী আন্দোলনের পুরোনো স্লোগান আবার উচ্চারণ করে—‘রুশরা ফিরে যাও’। আলবেনিয়ায় ঘটছে অন্য ধরনের প্রতিবাদ। ইভাঙ্কা ট্রাম্প ও জ্যারেড কুশনার সাজান দ্বীপে বিলাসবহুল সমুদ্রতট রিসোর্ট গড়তে চেয়েছিলেন। পাশাপাশি পিশে পোরো-নার্তা উপকূলীয় সংরক্ষিত বনভূমিতেও উন্নয়ন–পরিকল্পনা ছিল। অনেকের কাছে এটি ট্রাম্পের সেই বিতর্কিত প্রস্তাবের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে গাজাকে ধনী পর্যটকদের জন্য বিলাসবহুল সমুদ্রতট বানানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আলবেনিয়ার মানুষ এই পরিকল্পনা মেনে নেয়নি। তাদের মতে, ধনীদের জন্য তৈরি পর্যটন প্রকল্প দেশের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ। উন্নয়ন এমন হওয়া উচিত, যা সাধারণ মানুষের উপকারে আসে, কোনো একক শিল্পের শোষণের পথ খুলে দেয় না। এ ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, দুর্নীতি ও বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে যে নতুন ধরনের গণ–আন্দোলন গড়ে উঠছে, তা আগের আক্রমণাত্মক জাতিগত জাতীয়তাবাদ থেকে আলাদা। এ প্রসঙ্গে ইতিহাসের দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে আগামী মাসে ষোড়শ শতাব্দীর লিথুয়ানিয়ার গ্র্যান্ড ডাচির কিছু রাজমুকুট প্রদর্শিত হবে, যেগুলো সম্প্রতি আবার খুঁজে পাওয়া গেছে। একসময় এই রাজ্য বাল্টিক অঞ্চল থেকে বর্তমান ইউক্রেন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ প্রদর্শনীতে তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে সামনে আনা হবে—পোল্যান্ডের রাজা ও লিথুয়ানিয়ার গ্র্যান্ড ডিউক আলেক্সান্ডার ইয়াগিয়েলন, তাঁর মা অস্ট্রিয়ার এলিজাবেথ (যিনি চারজন রাজাকে জন্ম দিয়েছিলেন), এবং পোল্যান্ডের রাজা সিগিসমুন্ড দ্বিতীয় অগাস্টাসের দ্বিতীয় স্ত্রী বারবারা রাদজিভিল। এই মুকুটগুলো শুধু ইতিহাসের নিদর্শন নয়, বরং একটি যৌথ অতীতের প্রতীক। এগুলো সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন ইউরোপে বিবাহসূত্রে গড়ে ওঠা জটিল রাজতান্ত্রিক সম্পর্ক (যাকে আজ ‘সমন্বিত রাজতন্ত্র’ বলা হয়) কাস্তিল, আরাগন, কাতালোনিয়া কিংবা ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছিল। মাগিয়ারের ক্ষেত্রেও ইতিহাসের এই প্রতীকী ব্যবহার স্পষ্ট। তিনি হাঙ্গেরির একাদশ শতাব্দীর সেন্ট স্টিফেনের মুকুটকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। পার্লামেন্ট ভবনের ডোম হলে সেই মুকুটের সামনে তাঁর প্রার্থনার একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি প্রস্তাব করেন, নতুন সংসদ সদস্যদের ওই মুকুটের সামনে দাঁড়িয়ে শপথ নিতে হবে। এই মুকুট হাঙ্গেরির ইতিহাসে গভীর অর্থ বহন করে। ১৫২৬ সালে মোহাচের যুদ্ধে শেষ ইয়াগিয়েলন রাজা লুই দ্বিতীয় নিহত হওয়ার সময় তাঁর মাথায় ছিল এই মুকুট। পরে সেটি কাদামাটি থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপর প্রায় সব হ্যাবসবার্গ শাসক এই মুকুট ব্যবহার করেন—শুধু জোসেফ দ্বিতীয় ছাড়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে মুকুটটি হাঙ্গেরি থেকে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কেন্টাকির ফোর্ট নক্সে রাখা হয়, যেখানে আমেরিকার স্বর্ণভান্ডার রয়েছে। পরে ১৯৭৮ সালে এটি আবার হাঙ্গেরিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ছোট ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি হিসেবে যৌথ
📌 Kaynak
Bu haber XML kaynağından derlenmiştir. Tamamı için orijinal habere gidin.
Orijinal haberi oku →