জাপানিদের সেকেন্ড হোম কোন দেশ জানেন কি?
মাঠে ব্রাজিল জিতেছে, জাপান হেরেছে। স্কোরবোর্ডের গল্প সেখানেই শেষ। কিন্তু ইতিহাসের স্কোরবোর্ডে এই দুই দেশের সম্পর্কের হিসাব একেবারেই অন্যরকম। সেখানে গোলের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষের যাত্রা, কফির বাগান, সুশির গন্ধ, সাম্বার ছন্দ আর এমন এক অভিবাসনের গল্প, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়গুলোর একটি। ব্রাজিলের কাছে জাপানের হারটা নিছকই ফুটবল। সোয়া এক ঘন্টার লড়াই। বাঁশি বাজলেই যার সমাপ্তি। কিন্তু এই দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাস খুলে বসলে বোঝা যায়, মাঠের প্রতিপক্ষ হওয়ার বহু আগে ত
মাঠে ব্রাজিল জিতেছে, জাপান হেরেছে। স্কোরবোর্ডের গল্প সেখানেই শেষ। কিন্তু ইতিহাসের স্কোরবোর্ডে এই দুই দেশের সম্পর্কের হিসাব একেবারেই অন্যরকম। সেখানে গোলের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষের যাত্রা, কফির বাগান, সুশির গন্ধ, সাম্বার ছন্দ আর এমন এক অভিবাসনের গল্প, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়গুলোর একটি। ব্রাজিলের কাছে জাপানের হারটা নিছকই ফুটবল। সোয়া এক ঘন্টার লড়াই। বাঁশি বাজলেই যার সমাপ্তি। কিন্তু এই দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাস খুলে বসলে বোঝা যায়, মাঠের প্রতিপক্ষ হওয়ার বহু আগে তারা পরস্পরের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। অনেকেই জানেন না, জাপানের বাইরে সবচেয়ে বড় জাপানি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর বাস যুক্তরাষ্ট্রে নয়, কানাডায় নয়— ব্রাজিলে। আজ সেখানে প্রায় বিশ লাখ নিক্কেই বা জাপানি বংশোদ্ভূত মানুষ বাস করেন। একমাত্র জাপান ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও এত বড় জাপানি সম্প্রদায় নেই। একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, জীবনেরই অংশ এই গল্পের শুরু ১৯০৮ সালে। তখন জাপানে জনসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু চাষের জমি বাড়ছে না। কৃষকের জীবন কঠিন। অন্যদিকে ব্রাজিলে কফি শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর বিশাল কফি বাগানে শ্রমিকের সংকট তখন চরমে। ইতালীয় শ্রমিকরা দীর্ঘদিন এই শূন্যস্থান পূরণ করলেও ১৯০২ সালে শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে ইতালি সরকার ব্রাজিলে অভিবাসন কার্যত বন্ধ করে দেয়। ব্রাজিল তখন তাকায় প্রশান্ত মহাসাগরের অন্যপারে জাপানের দিকে। ১৯০৮ সালের ১৮ জুন কাসাতো মারু নামের একটি জাহাজ ৭৮১ জন জাপানি অভিবাসী নিয়ে সান্তোস বন্দরে পৌঁছায়। বেশির ভাগই কৃষক। তাদের স্বপ্ন ছিল, কয়েক বছর কাজ করে টাকা জমিয়ে আবার নিজের দেশে ফিরে যাওয়া। বাস্তবতা ছিল অনেক কঠিন। এই সেই কাসাতো মারু জাহাজ; এটাতে চেপেই শুরু হয়েছিল জাপানিদের অভিপ্রায়ন শুরু হয়েছিল ব্রাজিলে রিও মিজুনো (মাঝে কিমোনো পরা) ছিলেন প্রথম অভিবাসনের নেপথ্যে ভাষা অচেনা। খাবার অচেনা। আবহাওয়া অচেনা। কফি বাগানের শ্রম ছিল নির্মম। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন, কেউ পালালেন, কেউ ভেঙে পড়লেন। কিন্তু সবাই হাল ছাড়লেন না। শুরুটা ছিল কফি বাগানে শ্রমিকের কাজ ধীরে ধীরে তারা বুঝলেন, শুধু শ্রমিক হয়ে বেঁচে থাকা যাবে না। নিজের জমি চাই। তারপরই শুরু হলো এক নীরব বিপ্লব। জাপানি কৃষকেরা ছোট ছোট জমি লিজ নিয়ে আধুনিক কৃষিপদ্ধতি প্রয়োগ করলেন। সবজি, ফল, চা, পার্সিমন, স্ট্রবেরি—নতুন নতুন ফসলের চাষ শুরু হলো। অল্প জমি থেকে বেশি ফলন বের করার দক্ষতা তাদের ছিল জন্মগত অভ্যাসের মতো। অল্প সময়ের মধ্যেই সাও পাওলোর আশপাশের সবজি বাজারে জাপানি কৃষকদের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠল। পরে শুরু হয় জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ সেখান থেকে শুরু শহরমুখী অভিযাত্রা। কেউ ব্যবসায়ী হলেন, কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আজ ব্রাজিলের বহু গবেষক, উদ্যোক্তা, শিল্পোদ্যোক্তা, এমনকি রাজনীতিকও জাপানি বংশোদ্ভূত। শহরে এসেও মানিয়ে নিতে শুরু করে। তাদেরই উত্তর প্রজন্ম এখন সেখানে বেশ আছে কিন্তু সাফল্যের চেয়েও বিস্ময়কর তাদের সাংস্কৃতিক ভারসাম্য। ঘরের ভেতরে তারা জাপানি। ঘরের বাইরে তারা ব্রাজিলিয়ান। বাড়িতে এখনও মিসো স্যুপ রান্না হয়, সুশি বানানো হয়, পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা হয়। আবার বাইরে তারা চুরাসকো খায়, সাম্বার তালে নাচে, কার্নিভালে অংশ নেয়, ব্রাজিলের ফুটবল নিয়ে তর্ক করে। সাও পাওলোতে জাপানিদের এলাকা এই মিশ্রণ শুধু খাবারে নয়। আজ ব্রাজিলে এমন সুশিও পাওয়া যায়, যেখানে ক্রিম চিজ, ট্রপিক্যাল ফল কিংবা স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়। জাপানে একসময় যেটিকে অদ্ভুত বলা হতো, এখন সেটিই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় "ব্রাজিলিয়ান-স্টাইল সুশি"। তবে ইতিহাস এখানেই থেমে থাকেনি। ১৯৯০-এর দশকে জাপানের শিল্পকারখানায় শ্রমিকের সংকট দেখা দিলে সরকার বিদেশে বসবাসরত জাপানি বংশোদ্ভূতদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। তখন ঘটে ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর বাঁকগুলোর একটি। ব্রাজিলিও জাপানিরা আবার ফিরেছে জাপানে যে দাদু একশো বছর আগে কাজের সন্ধানে জাপান ছেড়ে ব্রাজিলে এসেছিলেন, তাঁর নাতি আবার কাজের খোঁজে ফিরে গেল জাপানে। কিন্তু এবার পরিচয়ের নতুন সংকট তৈরি হলো। চেহারা জাপানির মতো, ভাষা পর্তুগিজ। নাম তানাকা, কিন্তু মাতৃভাষা পর্তুগিজ। জাপানে তাকে বলা হয় ব্রাজিলিয়ান। ব্রাজিলে বলা হয় জাপানি। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলেন "ডাবল আইডেন্টিটি"—দুই সংস্কৃতির ভেতর সমান স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করার অভিজ্ঞতা। আজ জাপানের হামামাৎসু, টয়োহাশি কিংবা গুনমার কিছু এলাকায় পর্তুগিজ ভাষার সাইনবোর্ড দেখা যায়। ব্রাজিলিয়ান রেস্তোরাঁ, সাম্বা স্কুল, এমনকি ব্রাজিলিয়ান সুপারমার্কেটও রয়েছে সেখানে। আর আছে ফুটবল। গুনমায় জাপানিজ ব্র্যাজিলিয়ান সেন্টার আসাসুকা সাম্বা কার্নিভালে তরুণী এখানেই গল্পটা অনিন্দ্য হয়ে ওঠে। ব্রাজিল যখন জাপানের বিপক্ষে মাঠে নামে, গ্যালারিতে এমন হাজারো মানুষ থাকেন, যাদের পূর্বপুরুষ জাপানি, জন্ম ব্রাজিলে, আবার কেউ এখন জাপানের নাগরিক। তারা কাকে সমর্থন করবেন? উত্তরটা অনেক সময় স্কোরবোর্ডের চেয়েও জটিল। একটি পরিবারের ভাই ব্রাজিলের জার্সি পরে, আরেক ভাই জাপানের। বাবা ব্রাজিলের গোল হলে হাততালি দেন, মা জাপানের গোল হলে চুপচাপ হাসেন। খেলা শেষে সবাই একই টেবিলে বসে ভাত খায়। পাশে সুশি, আর গ্রিলে চুরাসকো। এটাই সম্ভবত এই গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। ড্যানিয়েলা সুজুকি ব্রাজিলের জাপানি বংশোদ্ভূত তারকা অভিনয়শিল্পী অভিবাসন শুধু মানুষকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে নিয়ে যায় না। সঙ্গে নিয়ে যায় ভাষা, রান্না, উৎসব, স্মৃতি, ভালোবাসা আর পরিচয়ের নতুন সংজ্ঞা। ফুটবলের স্কোর বদলে যায়। কিন্তু মানুষের তৈরি এই সেতুগুলো থেকে যায় শতাব্দীর পর শতাব্দী। ব্রাজিল–জাপান ম্যাচের ফল যেটাই হোক এ ম্যাচ কেউই হারে না তাই ব্রাজিলের কাছে জাপান হারলেও, এই ম্যাচে আসলে কেউ হারে না। কারণ মাঠের প্রতিপক্ষ দুই দেশ, ইতিহাসের পাতায় তারা একই পরিবারের দুই প্রজন্
📌 Kaynak
Bu haber XML kaynağından derlenmiştir. Tamamı için orijinal habere gidin.
Orijinal haberi oku →