বাহেদের ভাওয়াইয়া ইনস্টিটিউটের কথা ভুলি গেছেন?
বাংলার লোকসংগীতের অফুরন্ত খনি পূর্ববঙ্গের সঙ্গে আমাদের দৈহিক বিচ্ছেদ যে লোকসংগীতের ক্ষেত্রে কী অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে, তার মূল্যায়ন আজও হয়নি। সেই ভান্ডারের অধিকারী সেসব রিফিউজি পশ্চিম বাংলায় হাজারে হাজারে এসেছেন, মাটি থেকে শিকড় উপড়ানো তাঁদের পুঁজিপাটা রসের অভাবে প্রায় শুকিয়ে এসেছে। পদ্মার ওপার থেকে যেসব মাটির খাঁটি শিল্পী এসেছিলেন, তাঁরা যেন কোথায় হারিয়ে গেছেন। কলকাতায় অলিগলিতে সরোদ, সেতারের সাধক পাওয়া যায়, কিন্তু একজন দোতারা বাদক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এ দুঃখ ছিল প্রখ্যাত গণস
বাংলার লোকসংগীতের অফুরন্ত খনি পূর্ববঙ্গের সঙ্গে আমাদের দৈহিক বিচ্ছেদ যে লোকসংগীতের ক্ষেত্রে কী অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে, তার মূল্যায়ন আজও হয়নি। সেই ভান্ডারের অধিকারী সেসব রিফিউজি পশ্চিম বাংলায় হাজারে হাজারে এসেছেন, মাটি থেকে শিকড় উপড়ানো তাঁদের পুঁজিপাটা রসের অভাবে প্রায় শুকিয়ে এসেছে। পদ্মার ওপার থেকে যেসব মাটির খাঁটি শিল্পী এসেছিলেন, তাঁরা যেন কোথায় হারিয়ে গেছেন। কলকাতায় অলিগলিতে সরোদ, সেতারের সাধক পাওয়া যায়, কিন্তু একজন দোতারা বাদক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এ দুঃখ ছিল প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও নিবারণ পণ্ডিতের। একই পরিস্থিতি এখন ঢাকারও। নাগরিকদের সঙ্গে কৃষি সমাজ ও সংস্কৃতির বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। বলা হতো, কলকাতাকে ঘিরে যে কয়টা জেলা আছে—হাওড়া, হুগলি বা চব্বিশ পরগনা—লোকসংগীতের দিক দিয়ে তাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে নিষ্ফলা ভূমি বললে অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু কলকাতাকে ঘিরে থাকা এই নিষ্ফলা ভূমি কলকাতার সংস্কৃতির এই বারোবাজারি চরিত্রকে অনেকখানি সাহায্য করছে। ঢাকার পাশে মানিকগঞ্জ থাকার পরও একই কথা বলার সময় এসে গেছে। পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকার আশপাশে ভাটিয়ালির মাটি ও জল এমন সজীব যে সেখানে সে বিপদ খুব কম। সেখানকার নাগরিকদের কানে মেঠো সুরের রেশ সব সময় ভেসে আসে। গ্রামের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন নয়। আমলাশাসিত হলেও ঢাকা রেডিওর লোকসংগীতে তার আস্বাদ আজও আমরা খুঁজে পাই। এসব আধা শতাব্দীর আগের কথা। তবে এটা ঠিক, গৌহাটীতে বসে বিহু গীতে কিংবা ওজাপালিতে ভেজাল মেশানো খুব কঠিন। কিন্তু কলকাতার বা ঢাকার লোকসংগীতের আসরে সবই সম্ভব। শ্রোতার কান তৈরি নয়। মন মাটিতে বাঁধা নয়, বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া সুরকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করলেও শ্রোতার বুকে তা বেঁধে না। কারণ, সেই স্থান-কাল-হৃদয়ের বালাই এখানে নেই। গোয়ালপাড়ার যে মাহুত ব্রহ্মপুত্রের বাঘ বসতি জঙ্গলে জীবন বিপন্ন করে জীবিকার তাগিদে বন্য হাতির পাল খুঁজে বেড়ায় আর বন্দী হাতিকে অঙ্কুশের ঘা ও সুরেলা মরমি গানের স্পর্শ দিয়ে বশ মানায়, সেই মাহুতের জীবন একদিকে বীরত্বের, আরেক দিকে দরিদ্র কুটিরে অপেক্ষমাণ প্রিয়জনের বিরহ—এই সামগ্রিক জীবনের উপলব্ধি না থাকলে গোয়ালপাড়িয়া মাহুতের গানের সমঝদারি অসম্ভব—‘তোমরা গেইলে কি আসিবেন মোর মাহুত বন্ধু রে। ’ ভাওয়াইয়া ইনস্টিটিউটের মূল কাজ হবে শিক্ষার্থীদের ভাওয়াইয়া গান শেখানো, পাশাপাশি দোতারা ও অন্যান্য লোকবাদ্যযন্ত্র বাজানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া। দরকার দক্ষ প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা সংগীতের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন। আবুল মনসুর আহমদের ভাষায়, ‘কৃষ্টি সামাজিক ব্যক্তিত্ব। সামাজিকতা পল্লিজীবনের বৈশিষ্ট্য। এই দিক হইতে কালচারের ধারক ও বাহক পল্লিগ্রাম। শহরে সামাজিক জীবনের অভাব। সেখানে প্রতিবেশিত্ব গড়িয়া উঠিতে পারে না। শহরের বাসিন্দাদের অধিকাংশই ভাসমান জনতা। . . . দৌড় ছাড়া গতি নাই। নষ্ট করিবার সময় নাই। এই পরিবেশে প্রতিবেশিত্ব বা আত্মীয়তা গড়িয়া উঠিতে পারি না। পরিচয় যা ঘটে, তা নিতান্তই বৈষয়িক—সংক্ষিপ্ত দুই দণ্ড বসিয়া আলাপ করিবার সময় নাই। যাদের আছে তারা ক্লাবে যায়। ক্লাব প্রতিবেশিত্ব নয়। কাজেই শহরবাসীর চাল-চলন, স্বভাব-চরিত্র, ভাব গতিক এক হইতে পারে না। ফলে শহরের লোকেরা হয় মাল্টিকালার, শতরঙ্গা, রংবেরঙের লোক। ’ দুই. রাগসংগীতের, রবীন্দ্র-নজরুলের গানের আসরের শ্রোতা গুনে অনুরাগীদের হিসাব কষা যায়, সমঝদারির মূল্য নিরূপণ করা যায়, কিন্তু লোকসংগীতের কদর মাপা যায় কি এভাবে? রাগসংগীতের বৈজ্ঞানিক চর্চার ব্যবস্থা আছে। বিশেষ গুরুর কাছে বা স্কুলে বসে ঘরানা আয়ত্ত করা যায়। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকেও যায়, কিন্তু ভাওয়াইয়ার মতো সংগীতের নির্দিষ্ট স্বরলিপি নেই। নেই তার গুরুমুখী ঘরানা, যা আছে তার নাম বাহিরানা বা আঞ্চলিকতা। ছোটবেলা থেকে কানে শুনে, চোখে দেখে মনের ভাবে গান শেখা হয়। গলা কখন জুড়ে দিয়েছি বলতে পারি না। এই গায়কিটা হলো জল-মাটি-হাওয়ার। কিংবা পাহাড় বা উপত্যকার। গুরু একজন নন, গণসমষ্টি। ভাওয়াইয়ার জন্মদাতা হালুয়াচাষারা। এই সংগীতধারাকে সংরক্ষণ, চর্চা ও প্রসারের লক্ষ্যে দরকার ভাওয়াইয়া ইনস্টিটিউট। নতুন শিল্পীরা আসবেন কীভাবে? তরুণদের মধ্যে লোকসংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলে, স্থানীয় শিল্পীদের মূল্যায়ন করে এবং আমাদের আঞ্চলিক ঐতিহ্যকে জীবন্ত রেখেই তা হবে। শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখার জন্যই দরকার ভাওয়াইয়া ইনস্টিটিউট। ভাওয়াইয়া ইনস্টিটিউটের মূল কাজ হবে শিক্ষার্থীদের ভাওয়াইয়া গান শেখানো, পাশাপাশি দোতারা ও অন্যান্য লোকবাদ্যযন্ত্র বাজানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া। দরকার দক্ষ প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা সংগীতের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন। এ ছাড়া ইনস্টিটিউটটি গবেষণা ও সংরক্ষণমূলক কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হারিয়ে যেতে বসা পুরোনো গান সংগ্রহ, লোকশিল্পীদের জীবন ও কর্ম নিয়ে তথ্য সংরক্ষণ, এবং অডিও-ভিডিও আর্কাইভ তৈরি করার মাধ্যমে ভাওয়াইয়ার ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ধরে রাখা হবে। ভাওয়াইয়া ইনস্টিটিউট নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা ও উৎসব আয়োজন করবে, যা মানুষের মাঝে এই সংগীতের প্রতি আগ্রহ বাড়াবে। জাতীয় ও সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভাওয়াইয়া পরিবেশনের মাধ্যমে এটি দেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। কর্মশালা ও সেমিনারের মাধ্যমে নতুন শিল্পীদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও সৃষ্টি করা হয়। ভাওয়াইয়া ইনস্টিটিউট তো শুধু একটি সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র নয়, বরং এটি আমাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ষক। এর কার্যক্রমের মাধ্যমে ভাওয়াইয়া নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে এবং আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে। পূর্ববঙ্গের বাঙ্গালদের মূল সুর হচ্ছে ভাটিয়ালি, উত্তরবঙ্গের বাহেদের তেমনি ভাওয়াইয়া ও মধ্যবঙ্গের হচ্ছে বাউল রীতি আর পশ্চিম মানে রাঢ় বাংলায় বাঙালির ঝুমুররীতি। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ রকম ১৪টির মতো প্রতিষ্ঠান আছে। কেবল বাহেদের ভাওয়াইয়ার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। আবু সায়ীদদের এটির জন্যও প্রাণ লাগবে? নাহিদ হাসা
📌 Kaynak
Bu haber XML kaynağından derlenmiştir. Tamamı için orijinal habere gidin.
Orijinal haberi oku →