লিবনিজ এবং বাইনারি দুনিয়ার জন্মকথা
সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক চিন্তাবিদকে যখন সমাহিত করা হচ্ছিল, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষ। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল সোসাইটি এবং জার্মানির বার্লিন একাডেমি অব সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠানের আজীবন সদস্য ছিলেন তিনি। অথচ তাঁর মৃত্যুতে এই দুই প্রতিষ্ঠানের কেউই ন্যূনতম শোক প্রকাশ করার প্রয়োজন বোধ করেনি। শেষ জীবনটা তাঁর কেটেছিল চরম একাকিত্বে, আইজ্যাক নিউটনের সঙ্গে ক্যালকুলাসের আবিষ্কার নিয়ে তিক্ত এবং অন্তহীন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। নিউটন দাবি করেছিলেন, তাঁর আইডিয়া চুরি করা
সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক চিন্তাবিদকে যখন সমাহিত করা হচ্ছিল, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষ। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল সোসাইটি এবং জার্মানির বার্লিন একাডেমি অব সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠানের আজীবন সদস্য ছিলেন তিনি। অথচ তাঁর মৃত্যুতে এই দুই প্রতিষ্ঠানের কেউই ন্যূনতম শোক প্রকাশ করার প্রয়োজন বোধ করেনি। শেষ জীবনটা তাঁর কেটেছিল চরম একাকিত্বে, আইজ্যাক নিউটনের সঙ্গে ক্যালকুলাসের আবিষ্কার নিয়ে তিক্ত এবং অন্তহীন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। নিউটন দাবি করেছিলেন, তাঁর আইডিয়া চুরি করা হয়েছে। ইতিহাস অবশ্য পরে প্রমাণ করেছে, দুজনের আবিষ্কারই ছিল স্বাধীন। কিন্তু আজ আমরা গণিতে নিউটনের সেই জটিল প্রতীক ব্যবহার করি না, বরং সেই নিঃসঙ্গ মানুষটির তৈরি করা সহজ ও আধুনিক প্রতীকগুলোই ব্যবহার করি। এই দুর্ভাগা মানুষটির নাম গটফ্রিড উইলহেম লিবনিজ—আধুনিক ক্যালকুলাস ও বাইনারি গণিতের প্রকৃত জনক। তাঁর জীবনের গল্পে যাওয়ার আগে চলুন একটু ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলিয়ে নিই। সেটা এমন এক ইতিহাস, যার তাত্ত্বিক ভিত্তি লিবনিজ তৈরি করে গেছেন নিজের অজান্তেই। যে গণিতের নিয়মে টিকে আছে পুরো মহাবিশ্ব শেষ জীবনটা লিবনিজের কেটেছিল চরম একাকিত্বে, নিউটনের সঙ্গে ক্যালকুলাসের আবিষ্কার নিয়ে তিক্ত এবং অন্তহীন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। নিউটন দাবি করেছিলেন, তাঁর আইডিয়া চুরি করা হয়েছে। দুই ১৯৪৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি চমকপ্রদ খবর ছাপা হলো। সেখানে বলা হলো, ‘এমন এক বিস্ময়কর যন্ত্র তৈরি হয়েছে, যা ইলেকট্রনিক গতি ব্যবহার করে এমন সব গাণিতিক কাজ করতে পারে, যা আগে সমাধান করা অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ছিল।’ যন্ত্রটির নাম ছিল এনিয়াক। এটিই ছিল প্রথম দিককার সাধারণ ব্যবহারের কম্পিউটারগুলোর একটি। এই যন্ত্রটিকেই এখন কম্পিউটারের ইতিহাসে একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি তৈরি করা হয়েছিল। এর আকার ছিল রীতিমতো দানবীয়! ওজন ২৫ টনেরও বেশি। ১৫০ বর্গমিটারের বেশি জায়গা দখল করে রাখত। রিলে, রেজিস্টর বা ক্যাপাসিটরের মতো অন্যান্য মৌলিক ইলেকট্রনিক উপাদানের পাশাপাশি এতে ২০ হাজারটি ভ্যাকুয়াম টিউব ছিল। এগুলো মাইলের পর মাইল তার এবং প্রায় ৫০ লাখ হাতে ঝালাই করা জয়েন্টের মাধ্যমে যুক্ত ছিল। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এনিয়াক তৈরি করা হয়েছিল যন্ত্রটি চালাতে প্রয়োজন হতো ১ লাখ ৫০ হাজার ওয়াট বিদ্যুৎ। একটু তুলনা করলে বুঝতে পারবেন, আধুনিক একটি ডেস্কটপ কম্পিউটারে মাত্র ২০০ ওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। বিদ্যুতের এই বিপুল চাহিদার কারণে তখন একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল—যখনই এনিয়াক চালু করা হতো, ফিলাডেলফিয়া শহরের সব রাস্তার আলো নাকি ম্লান হয়ে যেত! আসলে এনিয়াক ছিল অনেকগুলো ইলেকট্রনিক যোগ করার যন্ত্র এবং অন্যান্য গাণিতিক ইউনিটের একটি বিশাল সংগ্রহ। এতে আধুনিক কম্পিউটারের মতো কোনো সংরক্ষিত প্রোগ্রাম বা অপারেটিং সিস্টেম ছিল না। আমাদের দশমিক পদ্ধতির দশটি অঙ্কের জন্য এতে ১০-পজিশন রিং কাউন্টার ব্যবহার করে সংখ্যা সংরক্ষণ করা হতো। প্রতিটি অঙ্কের জন্য প্রয়োজন হতো ৩৬টি ভ্যাকুয়াম টিউব। কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য মেশিনটিকে প্রোগ্রাম করতে এর সুইচ এবং কেবলগুলো হাত দিয়ে পরিবর্তন করতে হতো। একটি সমস্যার সমাধান বের করতে লেগে যেত কয়েক সপ্তাহ! গণিতের হিসাবে আর কতদিন টিকবে মানবজাতি এনিয়াক ১৫০ বর্গমিটারের বেশি জায়গা দখল করে রাখত। রিলে, রেজিস্টর বা ক্যাপাসিটরের মতো অন্যান্য মৌলিক ইলেকট্রনিক উপাদানের পাশাপাশি এতে ২০ হাজারটি ভ্যাকিউম টিউব ছিল। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, ভ্যাকুয়াম টিউবগুলোর আয়ু ছিল খুবই সীমিত। কোনো প্রোগ্রাম যদি ঠিকমতো কাজ না করত, তাহলে খারাপ টিউব বা ত্রুটিপূর্ণ জয়েন্ট খুঁজে বের করতে প্রোগ্রামারদের ওই বিশাল কাঠামোর ভেতরে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হতো। মজার ব্যাপার হলো, এনিয়াকের প্রথম প্রোগ্রামাররা সবাই ছিলেন নারী। যেমন, কে ম্যাকনাল্টি, বেটি জেনিংস, বেটি স্নাইডার, মার্লিন মেল্টজার, ফ্র্যান বিলাস এবং রুথ লিচটারম্যান। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁদের এই কাজের কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এমনকি প্রথম দিকে ইতিহাসবিদরা তাঁদের ভুল করে মেশিনের সামনে পোজ দেওয়া মডেল বলে মনে করেছিলেন! এনিয়াক এবং সমসাময়িক অন্যান্য মেশিনের বিশাল আকার ও বিপুল বিদ্যুৎ খরচের প্রধান কারণ ছিল ওই ভ্যাকুয়াম টিউব, যা সুইচ এবং অ্যাম্পলিফায়ার হিসেবে কাজ করত। আজকের দিনের ফিলামেন্ট লাইট বাল্বের মতো, ভ্যাকুয়াম টিউবগুলো ছিল বিশাল আকারের। আবার সেগুলো প্রচুর তাপ উৎপন্ন করত। নষ্টও হয়ে যেত ঘন ঘন। বেল ল্যাবরেটরিজের জন বারডিন, ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন এবং উইলিয়াম শকলি প্রথম ট্রানজিস্টর উদ্ভাবন করেন এই সমস্যার সমাধান আসে ১৯৪৭ সালে। বেল ল্যাবরেটরিজের উইলিয়াম শকলি, জন বারডিন এবং ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন প্রথম ট্রানজিস্টর উদ্ভাবন করেন। এটি তাঁদের কঠিন পদার্থ দিয়ে তৈরি একটি বৈদ্যুতিক সুইচ (ট্রানজিস্টর) তৈরির পথ দেখায়। ফলে ভ্যাকুয়াম টিউবের আর কোনো প্রয়োজন রইল না। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ১৯৫৬ সালে তাঁরা পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। ট্রানজিস্টরের আবিষ্কারকে এখনো প্রযুক্তির ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ট্রানজিস্টরগুলো ভ্যাকুয়াম টিউবের চেয়ে অনেক ছোট, দ্রুতগতির, বেশি নির্ভরযোগ্য এবং শক্তিশালী ছিল। ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৬০-এর দশকে, বিশাল ভ্যাকুয়াম টিউব দিয়ে তৈরি প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটারগুলোর জায়গা দখল করে নেয় ট্রানজিস্টর দিয়ে তৈরি দ্বিতীয় প্রজন্মের কম্পিউটার। ট্রানজিস্টরের এই আবিষ্কারই বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হওয়া ডিজিটাল বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, যা আজও চলমান। সৌন্দর্যের মহাজাগতিক ব্যাকরণ ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৬০-এর দশকে, বিশাল ভ্যাকিউম টিউব দিয়ে তৈরি প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটা
📌 Kaynak
Bu haber XML kaynağından derlenmiştir. Tamamı için orijinal habere gidin.
Orijinal haberi oku →