‘ঈদের ছুটি শেষে আইসা শুনি, আমার চাকরি নাই’
‘তিন বছর ধরে কারখানায় হেলপার হিসেবে কাজ করি। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে গেছিলাম। ছুটি শেষে সকালে কারখানায় ঢুকতেই তারা (কারখানা কর্তৃপক্ষ) আমার আইডি কার্ড নিয়া নিছে। চাকরি নাই কইয়া কইছে, “মোবাইলের মেসেজ দেখেন গা।” বাসায় গিয়া মোবাইলে দেখি, কোনো মেসেজ নাই। এখন আমি কী করুম?’ আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন আল মুসলিম গ্রুপের ঢাকার সাভারের উলাইল এলাকার কারখানার শ্রমিক নাজমা আক্তার। তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আল মুসলিম গ্রুপের সাভারের তিনটি কারখানা
‘তিন বছর ধরে কারখানায় হেলপার হিসেবে কাজ করি। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে গেছিলাম। ছুটি শেষে সকালে কারখানায় ঢুকতেই তারা (কারখানা কর্তৃপক্ষ) আমার আইডি কার্ড নিয়া নিছে। চাকরি নাই কইয়া কইছে, “মোবাইলের মেসেজ দেখেন গা।” বাসায় গিয়া মোবাইলে দেখি, কোনো মেসেজ নাই। এখন আমি কী করুম?’ আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন আল মুসলিম গ্রুপের ঢাকার সাভারের উলাইল এলাকার কারখানার শ্রমিক নাজমা আক্তার। তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আল মুসলিম গ্রুপের সাভারের তিনটি কারখানা থেকে ১ হাজার ৮৬৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। এর মধ্যে উলাইল এলাকার এ কে এম নিটওয়্যার লিমিটেড থেকে ১ হাজার ২৮৬ জন, রেডিও কলোনি এলাকার প্যাসিফিক ব্লু জিনস ওয়ার থেকে ৫২৯ জন ও আশুলিয়ার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস থেকে ৫৩ জন কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। ছাঁটাই করা শ্রমিকদের তালিকা–সংশ্লিষ্ট কারখানার ফটক-সংলগ্ন সীমানাপ্রাচীরের দেয়ালে টাঙানো হয়েছে। আল-মুসলিম গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আবু রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসায়িক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় শ্রম আইনের ২০ ধারায় তিনটি কারখানার ১ হাজার ৮৬৮ জনকে ছাঁটাই করা হয়েছে। সরকারি বিধিবিধান ও প্রতিষ্ঠানের সব নিয়ম মেনে শ্রমিকদের যাবতীয় পাওনা ও বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। শ্রম আইন মানা হয়নি দাবি শ্রমিকদের এদিকে আজ সকালে রেডিও কলোনি ও উলাইল এলাকার দুটি কারখানার সামনে জড়ো হয়েছিলেন ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকেরা। তাঁদের দাবি, ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে শ্রম আইন যথাযথভাবে মানা হয়নি। ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে কারখানা কর্তৃপক্ষের ব্যবসায়িক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় দাবি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। উলাইল এলাকার কারখানার সুইং সেকশনের শ্রমিক সাব্বির হোসেন বলেন, ‘ঈদের ছুটির আগে আমাদের ২০ দিনের বেতন দেয়। আমাদের কোনো নোটিশ না দিয়া ছাঁটাই করা হইছে। আজ (শনিবার) শুনি আমার চাকরি নাই। ওভারটাইম করতে হয় আর তারা বলে কাজ নাই।’ আরেক শ্রমিক সুকুমার রায় বলেন, ‘আমার চাকরির বয়স ১০ মাস। গত ২৬ (মে) তারিখ লাঞ্চ পর্যন্ত ডিউটি করছি। পরে ম্যানেজার ডাইকা বলল, “এক শিফটে কাজ করা হইছে। তোমরা ৬ তারিখে (৬ জুন) সকাল আটটায় আসবা, বিকেল পাঁচটায় ছুটি।” পরদিন মোবাইলে মেসেজ পাইলাম, “আপনাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হলো।” আমারে ২০ দিনের বেতন ৮ হাজার টাকা দেওয়া হইছে। আর মোবাইলে পাইছি ১৬০০ টাকা।’ একাধিক শ্রমিক ও শ্রমিকনেতা বলছেন, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর ২০ ধারা অনুসারে কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই করতে পারে। এ ধরনের ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে ২১ ধারা অনুসারে ছাঁটাই করা শ্রমিকদের পরবর্তী সময়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন সাপেক্ষে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবার নিয়োগ দেওয়া হবে বলে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। এভাবে শ্রমিক ছাঁটাই করে অন্য শ্রমিকদের বেশি চাপ দিয়ে অতিরিক্ত কাজ আদায়, ইনক্রিমেন্ট এবং গ্রেড বৃদ্ধি পাওয়ায় খরচ কমানোর কৌশল বলে দাবি করেছেন তাঁরা। কী আছে আইনে শ্রম আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী, কোনো শ্রমিককে প্রয়োজনের অতিরিক্ততার কারণে ছাঁটাই করা যাবে। কোনো শ্রমিক কোনো মালিকের অধীনে অবিচ্ছিন্নভাবে অন্তত এক বছর চাকরি করলে তাঁকে ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে মালিককে কারণ উল্লেখ করে এক মাসের লিখিত নোটিশ দিতে হবে অথবা নোটিশ মেয়াদের জন্য নোটিশের পরিবর্তে মজুরি দিতে হবে। ক্ষতিপূরণ বাবদ তাঁকে প্রতিবছরের চাকরির জন্য ৩০ দিনের মজুরি বা গ্র্যাচুইটি দিতে হবে। ২১ ধারায় বলা হয়েছে, ছাঁটাইয়ের এক বছরের মধ্যে কারখানার মালিক আবার কোনো শ্রমিক নিয়োগ দিতে ইচ্ছুক হলে ছাঁটাই করা শ্রমিকের সর্বশেষ ঠিকানায় নোটিশ পাঠিয়ে চাকরির জন্য আবেদন করতে আহ্বান জানাবেন। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে কোনো শ্রমিক আবার চাকরির জন্য আবেদন করলে তাঁকে নিয়োগের ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ রকম একাধিক শ্রমিক প্রার্থী হইলে তাঁদের মধ্যে আগের চাকরির জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন সম্পাদক খায়রুল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ছাঁটাই করা শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থান কী হবে, তা নিয়ে ভাবা দরকার ছিল। তিনি বলেন, অন্যান্য সেক্টরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক দক্ষ হয়ে উঠলে চাকরির নিশ্চয়তা বাড়ে। কিন্তু তৈরি পোশাক খাতে উল্টোটা হয়। এখানে চাকরির বয়স বেশি হলে চাকরির গ্রেড ও বেতন বাড়ায় শ্রমিকদের ছাঁটাই আতঙ্কে থাকতে হয়। এই খাতে যাঁদের ইনক্রিমেন্ট ও গ্রেড বৃদ্ধির কারণে বেতন বেড়ে যায়, তখন কারখানা কর্তৃপক্ষ ব্যয় কমানোর কৌশল হিসেবে ওই শ্রমিকদের ছাঁটাই করে নতুন শ্রমিক নিয়োগ দেয়। উলাইল এলাকার কারখানার সুইং সেকশনের নারী অপারেটর জোসনা বলেন, ‘২০০৩ সালে হেলপার হিসেবে কারখানায় কাজ শুরু করছিলাম। পরের বছর বের হইয়া যাই। এরপর ২০০৯ সালে অপারেটর হিসেবে জয়েন করি। ঈদের ছুটির আগে ২৬ তারিখ বেলা ১টা পর্যন্ত ডিউটি করছি। এর আগে ডায়রিয়ার সময় রিকুয়েস্ট করছি, বিকেল পাঁচটায় ছুটি দেন, দেয় নাই। উল্টো জুলুম কইরা কাজের পাহাড়ের ওপর বসাইছে। ঘণ্টায় ২৫০ পিস কইরা কাজ দিতে হইবে বলছে। ঈদের ছুটি শেষে আইসা শুনি, আমার চাকরি নাই।’
📌 Kaynak
Bu özet Prothom Alo (BD) kaynağından otomatik derlenmiştir. Tamamı için orijinal habere gidin.
Orijinal haberi oku →